কেমন বাজেট পাচ্ছে বাংলাদেশ?

দীর্ঘ ১৯ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই বাজেটকে ঘিরে যেমন রয়েছে উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনা, তেমনি রাজস্ব আহরণ, ঋণনির্ভরতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন।
নতুন বাজেটের অন্যতম বার্তা হচ্ছে করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বিস্তৃত করা, অর্থনীতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় নিয়ে আসা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। তবে একই সঙ্গে এটি একটি বড় ঘাটতি ও ঋণনির্ভর বাজেট, যার প্রভাব আগামী অর্থবছরে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়তে পারে।
বড় বাজেট, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য
সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করেছে। আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে গত কয়েক বছরে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক নিম্নমুখী থাকায় এই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বিনিয়োগের ধীরগতি, উচ্চ সুদহার, রাজস্ব ঘাটতি এবং বেসরকারি খাতের সীমিত কার্যক্রমের বাস্তবতায় প্রবৃদ্ধির এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
কর ছাড়ের সুবিধা, করজালের বিস্তার
এবারের বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিভিন্ন খাতে কর ও মূল্য সংযোজন করের ছাড়। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে খাদ্যপণ্য, কৃষি উপকরণ, ওষুধ, চিকিৎসা সামগ্রী এবং প্রযুক্তিপণ্যে কর রেয়াতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মাংস, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল ও চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি সারের ওপর মূল্য সংযোজন কর প্রত্যাহার, কীটনাশকে শুল্ক ছাড় এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয় কমানোর পদক্ষেপ রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমাতে হৃদরোগের রিং, চোখের লেন্স, কিডনি ডায়ালাইসিসের সরঞ্জাম এবং ক্যানসারের ওষুধ তৈরির কাঁচামালে শুল্ক ও কর ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি খাতেও রয়েছে প্রণোদনা। মোবাইল সিমের ওপর বিদ্যমান নির্দিষ্ট কর প্রত্যাহারের পাশাপাশি দেশীয়ভাবে উৎপাদিত মোবাইল ফোন, কম্পিউটার মনিটর, মেমোরি কার্ড, প্রিন্টার ও রেফ্রিজারেটরের ওপর কর কমানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংগীত, চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক শিল্পভিত্তিক কর্মকাণ্ডে কর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। প্রথমবারের মতো স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনি স্বীকৃতির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতারাও কিছু কর সুবিধা পেতে পারেন।
করহার অপরিবর্তিত, নজরদারি বাড়ছে
সরকারের লক্ষ্য করহার বাড়ানো নয়, বরং করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি করা। এ কারণে ব্যাংক হিসাব খোলা, ব্যবসায়িক ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর, রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র এবং ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যভান্ডারকে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক, ভূমি অফিস, ইউটিলিটি সেবা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংস্থার তথ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। ফলে কর ফাঁকি শনাক্ত করা সহজ হবে বলে মনে করছে সরকার। খুচরা ব্যবসায়ীসহ সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরকে কর কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে করহার অপরিবর্তিত থাকলেও করজালের বাইরে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়বে।
অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ
বাজেটের আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ রাখা। জমি, ফ্ল্যাট কিংবা ভবন কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য এবং দলিলমূল্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলে করদাতা তা স্বেচ্ছায় ঘোষণা করতে পারবেন। নির্ধারিত কর পরিশোধের মাধ্যমে সেই অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হবে। সরকার এটিকে কর প্রশাসনের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সমালোচকদের মতে, এটি কার্যত নতুন কাঠামোয় কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি করছে।
ধনীদের ওপর বাড়তি করের ইঙ্গিত
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে সম্পদ কর চালুর আলোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান সারচার্জ কাঠামো বহাল রাখা হয়েছে।
তবে বিলাসবহুল গাড়ি, হেলিকপ্টার, আগ্নেয়াস্ত্র এবং অন্যান্য বিলাসপণ্যের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়করও বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক ও প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব রয়েছে।
মধ্যবিত্তের জন্য স্বস্তি নাকি নতুন চাপ?
করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে কিছু করদাতা স্বস্তি পেলেও অন্যদিকে সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস এবং জীবনবিমাসহ বিভিন্ন বিনিয়োগে কর সুবিধা কমানো হচ্ছে।
বিশেষ করে সঞ্চয়পত্রের মুনাফাকে আর চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য না করার প্রস্তাবের ফলে অনেক মধ্যবিত্ত সঞ্চয়কারীকে অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত।
ঋণনির্ভর বাজেট নিয়ে উদ্বেগ
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হওয়ায় বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কতটা সম্ভব?
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। নিত্যপণ্যে কর ছাড়, কৃষি খাতে প্রণোদনা এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়ক হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র কর ছাড় দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ শৃঙ্খলার উন্নয়ন, সমন্বিত মুদ্রানীতি এবং দক্ষ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
শেষ কথা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে এক কথায় বলা যায়— কর ছাড়, সামাজিক সুরক্ষা, করজাল সম্প্রসারণ এবং ঋণনির্ভর উচ্চাভিলাষের বাজেট।
একদিকে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানো, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ডিজিটাল ও সৃজনশীল অর্থনীতিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ রয়েছে। অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, বড় বাজেট ঘাটতি, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ।
ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— এই বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। কারণ বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে কেবল পরিকল্পনার ওপর নয়, বরং তার বাস্তবায়নের দক্ষতা ও সক্ষমতার ওপর।






