রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে চায় বিএনপি

তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন এবং গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করতে চায় বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ক্ষমতায়ন, সামাজিক উন্নয়ন এবং জনঅংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে দলটি।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তৃণমূলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছেন। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
দলটির নেতারা জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মতামতের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’ রূপরেখা। এতে সাংবিধানিক সংস্কার, অর্থনৈতিক মুক্তি, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা রয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের দক্ষ করে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য কর্মী তৈরি করা নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনা, জনসেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মতো দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যদি তাদের সংস্কার পরিকল্পনা কার্যকরভাবে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে এবং সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রীয় গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে সফল হয়, তাহলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক ও গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূল পর্যায়ে ৩১ দফা কর্মসূচি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরতে কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। এসব কর্মশালায় দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞরাও অংশ নিয়ে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
এদিকে সংগঠনের শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়েও কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। সম্প্রতি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সতর্ক করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ে কোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গ বা নেতিবাচক আচরণ বরদাশত করা হবে না। জনগণের আস্থা ধরে রাখা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পুনর্গঠন প্রক্রিয়াও জোরদার করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, জনকল্যাণকে কেন্দ্র করেই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে বিএনপি। সে কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণকে উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, খাল খনন কর্মসূচিতে যন্ত্রপাতির পাশাপাশি শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। একইভাবে মাদকবিরোধী সচেতনতা বাড়াতে উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু সরকার পরিচালনা নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার এবং টেকসই জাতীয় উন্নয়নের জন্যও তৃণমূলের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা রূপরেখাকে ভিত্তি করে দেশব্যাপী প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জনগণের আস্থা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তারেক রহমানের বার্তা হলো—স্বৈরতন্ত্রের অবসান এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জনগণের সক্রিয় সমর্থন ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনীতি বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ ইতিবাচক। এতে দল ও সরকার উভয়ের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হতে পারে।
তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ তৃণমূলকে আরও সক্রিয় করবে, সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করবে এবং মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা বাড়াবে। রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক অপরাধ দমনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনার সুযোগও কমে আসবে।
বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের শূন্যতা পূরণে বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার ও দলের কার্যক্রমের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পুনর্গঠন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে দলের শীর্ষ নেতারা যুক্ত থাকায় যে সাংগঠনিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে নতুন ও সক্রিয় নেতৃত্বকে সামনে আনার চেষ্টা চলছে।
দলীয় শৃঙ্খলার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করে সূত্রটি জানায়, নেতাকর্মীদের কোনো ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বা বিশৃঙ্খলার কারণে যাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে হাইকমান্ড সতর্ক রয়েছে। সম্প্রতি এক সভায় তারেক রহমান স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, জনগণের সঙ্গে কোনো ধরনের অসৌজন্যমূলক আচরণ বা শৃঙ্খলাভঙ্গ সহ্য করা হবে না। এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের ভিত্তিতে ৩১ দফা রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য দলীয় সংকীর্ণতার বাইরে গিয়ে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
তিনি বলেন, এ পরিকল্পনায় তৃণমূলের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়েও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।





