তিন মাসে খেলাপি ঋণ বাড়ল ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, হার ছাড়াল ৩২ শতাংশ

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কোনোভাবেই লাগাম টানা যাচ্ছে না। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এর ফলে গত মার্চ শেষে মোট খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়, যা ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
প্রতি তিন মাস পর পর দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের চিত্র প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের অর্থাৎ ৩১ মার্চ পর্যন্ত হালনাগাদকৃত সেই প্রতিবেদন গতকাল প্রকাশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ২০ betting হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ খেলাপির হার ছিল ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
অথচ চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ বিতরণের গতি ছিল বেশ ধীর। এই সময়ে বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি মাত্র ৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকায়। কিন্তু ঋণ বিতরণ না বাড়লেও একই সময়ে খেলাপি ঋণ লাফিয়ে বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় ঠেকেছে। এর ফলে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠে ইতিহাস গড়েছিল।
লুকোচুরি না থাকায় প্রকৃত চিত্র সামনে আসছে: বাংলাদেশ ব্যাংক
খেলাপি ঋণ হঠাৎ এভাবে বেড়ে যাওয়ার পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত পরিবর্তন ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘খেলাপি ঋণের হিসাবায়নের ক্ষেত্রে অতীতের মতো এখন আর কোনো তথ্য গোপন বা লুকোচুরি করা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী খেলাপির যোগ্য সব ঋণই এখন ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতার সঙ্গে তুলে ধরা হচ্ছে। এ কারণেই খেলাপি ঋণের অঙ্ক কিছুটা বেড়েছে। পাশাপাশি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান বিরাজমান পরিস্থিতিরও একটি নেতিবাচক প্রভাব এখানে রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০০৯ সাল-পরবর্তী বিগত ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে যেসব বেনামি ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, সেগুলো খেলাপি হলেও নানা রাজনৈতিক কৌশলে আড়ালে রাখা হতো। কিন্তু ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং খাতে সংস্কার শুরু হওয়ায় সেই লুকিয়ে রাখা সব খেলাপি ঋণ এখন সামনে আসছে। সাধারণত বছরের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ব্যাংকগুলো ঋণ পুনঃতফসিল করার ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দেয়, যে কারণে গত ডিসেম্বরে খেলাপি কিছুটা কমেছিল। তবে এখন নতুন করে কিছু বড় ঋণ খেলাপি হওয়ায় সামগ্রিক পরিমাণ আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংক খাতে পূর্ণ সুশাসন ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
সঞ্চিতি ঘাটতি ও মন্দ ঋণের ভয়াবহতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও একটি আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণও আকাশচুম্বী হয়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে সঞ্চিতি ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে মার্চ শেষে সেই ঘাটতি ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশেরই মান এখন ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক’ (ব্যাড ডেট) পর্যায়ে চলে গেছে। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ব্যাংকিং নিয়মে এই ধরনের ঋণ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় করার আর কোনো সুযোগ থাকে না বললেই চলে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক
গত মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের হারে বরাবরের মতোই সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো। এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এই সময়ে সরকারি ব্যাংকগুলো মোট ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী এসব ব্যাংকের ১ লাখ ৩ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার কথা থাকলেও, তারা রাখতে পেরেছে মাত্র ২৮ wedding হাজার ৮৬ কোটি টাকা। ফলে সরকারি ব্যাংকেই প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটিও প্রকৃত চিত্র নয়; কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ নীতিগত ছাড় বা ওয়েভার নেওয়ার কারণেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো কাগজে-কলমে ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা কম দেখাতে পারছে।
অন্যদিকে, গত মার্চ শেষে দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের স্থিতি ছিল ১৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪ লাখ ১৬ candlesticks হাজার ৪৮১ কোটি টাকা খেলাপি খাতাভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশই এখন খেলাপি। এই খাতের ব্যাংকগুলোর সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৩১০ কোটি টাকায়।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকগুলো মার্চ শেষে মোট ৪৭ হাজার ৮৬ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছিল, যার মধ্যে ১৯ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে আছে। শতকরা হিসাবে এই ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ। তবে দেশের কার্যরত বিদেশী ব্যাংকগুলোর অবস্থা তুলনামূলক অনেক ভালো। তাদের বিতরণ করা ৬৭ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে মাত্র ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি তালিকায় রয়েছে।





