হাইকমান্ডের নির্দেশনা অমান্য করে তৃণমূলে যোগদানের হিড়িক, চাপে বিএনপি

দলে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা থাকলেও তা মানছেন না তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী—এমন অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–এর ভেতর থেকেই। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, একদিকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে যোগদানের প্রতিযোগিতা—এই দ্বৈত বাস্তবতায় এখন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে দলটি।
দলীয় হাইকমান্ড দুই দফায় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে বিএনপিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই নির্দেশনা অনেক জায়গায় উপেক্ষিত হচ্ছে। স্থানীয় কোন্দল, প্রভাব বিস্তার এবং নিজেদের শক্তি বাড়ানোর তাগিদে বিভিন্ন এলাকায় নতুন নেতাকর্মীদের দলে টানা হচ্ছে। এতে দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত যোগদান দলীয় শৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে বড় সংকট ডেকে আনতে পারে।
তবে তৃণমূল নেতাদের দাবি ভিন্ন। তাঁদের মতে, কেন্দ্র থেকে পরিষ্কার বার্তা রয়েছে—চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী বা বিতর্কিত কাউকে দলে নেওয়া যাবে না। কিন্তু যাঁদের অতীত কর্মকাণ্ড স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য, তাঁদের অন্তর্ভুক্তিতে কোনো বাধা নেই। তাঁদের ভাষ্য, বিতর্কিত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঘটছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয়।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আগের নির্দেশনাই কার্যকর রয়েছে।
দলীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বিএনপির হাইকমান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান বন্ধের নির্দেশনা জারি করে। রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ওয়ার্ড থেকে জাতীয় পর্যায়ের কোনো কমিটিতে অন্য দলের কেউ বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। এ নির্দেশনা দল ও অঙ্গসংগঠনের সব স্তরে মেনে চলতে বলা হয়। পরে ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি আবারও একই নির্দেশনা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূলের অনেক নেতা তা মানছেন না। ফলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা কৌশলে বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন।
এর ধারাবাহিকতায় গোপালগঞ্জ–২ আসনে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ছনোয়ার হোসেন মোল্লা ও নুর ইসলাম শেখের নেতৃত্বে প্রায় ১২০০ নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দেন। সদর উপজেলার নিজড়া ইউনিয়নের জাঙ্গাল বাজার এলাকায় আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে দল পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্র বলছে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এই যোগদান ঘটে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ছনোয়ার হোসেন মোল্লা এলাকায় জনপ্রিয় হলেও অতীতে নির্বাচনে পরাজয়ের অভিযোগ রয়েছে। দলীয় মূল্যায়নের অভাব এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে তাঁরা বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন বলে জানা যায়। একই সঙ্গে অন্যান্য ইউনিয়ন থেকেও আরও যোগদানের গুঞ্জন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক সংসদ সদস্য বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন দল থেকে অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় ব্যক্তিরা যোগ দিলে তাঁদের স্বাগত জানানো হবে।
নবাগত নেতা ছনোয়ার হোসেন মোল্লা ও নুর ইসলাম শেখ জানান, এলাকার উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তাঁরা বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। দলের আদর্শ বাস্তবায়নে সক্রিয় থাকার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তাঁরা।
এর আগে ৫ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের টঙ্গীতে জাতীয় পার্টি–এর (জিএম কাদের) একাধিক স্থানীয় নেতা ও শতাধিক কর্মী বিএনপিতে যোগ দেন। একইভাবে ২৮ জানুয়ারি কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় আওয়ামী লীগের একাংশের নেতাকর্মীরাও বিএনপিতে যোগ দেন।
দলীয় আরেকটি সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের মে ও জুনে নতুন সদস্য সংগ্রহের সময় একটি শর্ত দেওয়া হয়েছিল—যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, লুটপাট বা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ নেই, কেবল তাঁদেরই অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে সেই শর্ত উপেক্ষা করে বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্য ও গোপনে দলবদল চলছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিএনপির সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক (রাজশাহী বিভাগ) আমিরুল ইসলাম খান আলিম বলেন, নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এখনো নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান–এর নির্দেশনা মেনে চলা সবার দায়িত্ব।
অন্যদিকে সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক (ফরিদপুর) সেলিমুজ্জামান সেলিমের ভাষ্য, যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই এবং অতীতে দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নেই, তাঁদের যোগদানে বাধা নেই। তবে চিহ্নিত অপরাধীদের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। গোপালগঞ্জে কীভাবে যোগদান হলো—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা সম্পর্কে তাঁর জানা নেই।
সামগ্রিকভাবে, কেন্দ্রের নির্দেশনা ও তৃণমূলের বাস্তবতার এই ফারাক বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।





