ঈদের আগেই আগুনে সর্বস্বান্ত, খোলা আকাশের নিচে শতাধিক পরিবার

ঈদের আনন্দের ঠিক আগমুহূর্তে আগুন কেড়ে নিল শতাধিক পরিবারের স্বপ্ন। চারদিকে পোড়া গন্ধ, ধ্বংসস্তূপের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা টিন, কাঠ, কাপড় আর ভাঙাচোরা ঘরের সামগ্রী—এই চিত্র এখন রাজধানীর কালশীর বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে। কেউ পোড়া ঘরের ভেতর থেকে অবশিষ্ট কিছু খুঁজে ফেরেন, আবার কেউ পোড়া টিন কুড়িয়ে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করছেন। আর একদিন পরই ঈদুল আজহা, অথচ এসব মানুষের মাথার ওপর নেই কোনো ছাদ।
সোমবার (২৫ মে) সন্ধ্যায় পল্লবীর কালশী এলাকার বাউনিয়াবাঁধ বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
মঙ্গলবার সকালে স্থানীয়রা জানান, বস্তির অন্তত ১০০ থেকে ১৫০টি ঘর আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা পোড়া ঘরের ভেতর মূল্যবান কিছু খুঁজে পাওয়ার আশায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে তাদের মধ্যে খাবার বিতরণ করতে দেখা গেছে।
সুনামগঞ্জের বাসিন্দা বকুলা বেগম প্রায় সাত বছর ধরে পরিবার নিয়ে এই বস্তিতে বসবাস করছিলেন। আগুনে তাঁর দুটি ঘর পুড়ে গেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘দুইটা রুমে ৯ জন মানুষ থাকতাম। ভাবছিলাম ঈদের পরে এই জায়গা ছাড়ব। আমরা গরিব মানুষ, ঈদের সময় বাসায় বাসায় গিয়ে মাংস নিয়ে আসি। ওই মাংস দিয়ে দুই দিন ভালো খাই। কিন্তু এবার সব শেষ। মাংস আনব, রান্না করব কোথায়? মাথার ওপর কোনো ছাদ নাই। আমাদের ঈদ এবার খোলা আকাশের নিচে।’
আগুন লাগার মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘বিধবা ভাতার টাকা আনছিলাম, খরচও করতে পারি নাই। হঠাৎ আগুন লাগে। পরনের কাপড় নিয়েই সবাই ঘর থেকে বের হইছি।’
একই বস্তির বাসিন্দা মো. নবাব জানান, আগুনে তাঁর ১৫টি ঘর ও একটি মুদি দোকান পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এই শহরে ২০ বছর যা কামাইছি, এক আগুনে সব শেষ। দোকানে কয়েক লাখ টাকার মাল ছিল, সব পুড়ে গেছে। কত কষ্ট করে ঘর তুলছিলাম, আজ কিছুই নাই।’
ঈদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর কোরবানি দেই। আজ গরু আনার কথা ছিল। কিন্তু এখন থাকার জায়গাই নাই। ঈদের দিন রাস্তায় ঘুমাতে হবে। আমাদের এবারের ঈদ নেই।’
কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা শাহীন আলম পাঁচ বছর ধরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এই বস্তিতে ভাড়া থাকেন। ভাঙারির দোকানে কাজ করে সংসার চালান তিনি। ঈদের পর কিস্তিতে টাকা তুলে একটি রিকশা কেনার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু আগুনে ঘরের মালামালের সঙ্গে ৪২ হাজার টাকাও পুড়ে গেছে।
শাহীন বলেন, ‘ভাবছিলাম ঈদের পরে একটা রিকশা কিনব, আর ভাঙারির দোকানে কাজ করব না। কিন্তু আগুনে সব শেষ। সামনে ঈদ, বউ-বাচ্চা নিয়ে কোথায় থাকব জানি না। মানুষ ঈদ করবে, আর আমরা কোথায় থাকব এই চিন্তায় রাত কাটাতে হবে।’
মঙ্গলবার সকাল থেকেই বস্তির বাসিন্দারা পোড়া ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে নেমেছেন। কেউ পোড়া টিন, কেউ ভাঙা ঘরের সরঞ্জাম বের করছেন। পরে সেগুলো ভাঙারির দোকানে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব সংগ্রহে ভ্যান, অটোরিকশা ও ছোট ট্রাকও বস্তিতে ঢুকতে দেখা গেছে।
বাসিন্দা মোহাম্মদ সবুজ জানান, আগুনে তাঁর ১১টি ঘর পুড়ে গেছে। ক্ষতির কিছুটা পুষিয়ে নিতে পোড়া টিন বিক্রি করছেন তিনি। ‘যা পাই, তা দিয়েই আবার শুরু করতে হবে,’ বলেন তিনি।
মোতালেব নামের আরেক বাসিন্দা জানান, তাঁর একটি ভাঙারির দোকান, গোডাউন ও তিনটি ঘর আগুনে পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার পর এক কাপড়ে পরিবার নিয়ে বের হয়ে আসছি। আগুনের তাপে কেউ বস্তিতে থাকতে পারে নাই। ফায়ার সার্ভিস সবাইকে বের হয়ে যেতে বলছিল।’






