অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এনবিআরে প্রকৃত সংস্কার হয়নি: অর্থমন্ত্রী

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগ আলাদা করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা প্রকৃত কোনো সংস্কার ছিল না। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল একটি ‘হাফ-বেকড’ বা অসম্পূর্ণ উদ্যোগ। তিনি বলেন, কোনো সংস্কার না থাকার চেয়ে অসম্পূর্ণ সংস্কার আরও বেশি জটিলতা তৈরি করে।
সোমবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘সোনার বাংলা নীতি আলোচনা ২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বণিক বার্তা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এনবিআরকে দুই ভাগে বিভক্ত করা এখন সময়ের দাবি। তবে করনীতি কারা নির্ধারণ করবেন, সেটিই বড় প্রশ্ন। সরকার চায় না করনীতি পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে থাকুক। তাঁর মতে, শুধু আমলাদের হাতে নীতিনির্ধারণ থাকলে বড় ধরনের সংস্কারের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
তিনি জানান, এনবিআর সংস্কারসংক্রান্ত বিল বর্তমানে সংসদে আটকে আছে। বিষয়টি আরও কার্যকর করতে একটি কমিটি কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। এতে বক্তব্য দেন জহির উদ্দিন স্বপন ও মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদেরা।
১ হাজার ৩০০ প্রকল্প যাচাই করছে সরকার
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে চলমান প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্পের উপযোগিতা যাচাই করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, অনেক প্রকল্প দুর্নীতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থে নেওয়া হয়েছিল, যেগুলোর বাস্তব কোনো জনউপকারিতা নেই।
তিনি বলেন, এখন থেকে শুধু জনকল্যাণমূলক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রকল্প চালু রাখা হবে। নতুন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে অর্থের সঠিক ব্যবহার, বিনিয়োগের রিটার্ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, আগামী পাঁচ বছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে আগামী দুই বছরের মধ্যে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়েও কাজ চলছে।
‘ঘুষের সংস্কৃতি কমাতে হবে’
দুর্নীতি প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে সরাসরি যোগাযোগনির্ভর ব্যবস্থার কারণেই ঘুষের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। যাঁরা ব্যবসা সহজীকরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের অপ্রয়োজনীয় করে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, চুরির আশঙ্কায় নীতিনির্ধারণ বন্ধ রাখা যাবে না। দুর্নীতি ঠেকানোর দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক–এর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
আইএমএফের কিছু শর্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সব শর্ত দেশের অর্থনীতির জন্য উপযোগী নয়। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থেকেই সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।
বিএসইসিতে বড় সংস্কারের ইঙ্গিত
পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন–এ বড় ধরনের সংস্কার আনা হবে। সেখানে রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসিসহ আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
জ্বালানি খাত নিয়ে তিনি বলেন, আগের সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের দায় বর্তমান সরকার বহন করছে। ইতিমধ্যে জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।
বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় নেপাল থেকে ভারতের গ্রিড ব্যবহার করে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি রাশিয়ার সহায়তায় নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চলতি বছরের মাঝামাঝি প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার আশা করছে সরকার।
তিনি আরও বলেন, মহেশখালীতে বড় আকারের গ্যাস সংরক্ষণ ও আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য অন্তত তিন মাসের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করা।
নতুন খাতে রপ্তানি সুবিধার আশ্বাস
রপ্তানি খাত নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প যেসব বন্ড ও শুল্কসুবিধা পায়, ভবিষ্যতে ইলেকট্রনিকস, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও গোল্ড জুয়েলারির মতো সম্ভাবনাময় খাতকেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হবে।
তিনি জানান, ডায়মন্ড কাটিং ও গোল্ড জুয়েলারি রপ্তানির জন্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে আহসান খান চৌধুরী বলেন, এ মুহূর্তে কর ও শুল্ক বাড়ানো হলে পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। তিনি ব্যবসাবান্ধব নীতিমালার আহ্বান জানান। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ–এর সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। সংস্কারের উদ্যোগ অনেক সময় বাস্তবায়নের পর্যায়ে গিয়ে থেমে যায়। মোস্তফা কামাল বলেন, ব্যবসা সহজীকরণের বদলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে। শরিফ জহির বলেন, শিল্প খাতে গ্যাসের উচ্চমূল্য দেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। আনোয়ার উল আলম বলেন, শিল্প খাতের জন্য জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা দূর করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এ কে এনামুল হক, জাহাঙ্গীর আলম খান, আমিরুল হক, শাদাব আহমেদ খান, শওকত আজিজ রাসেল, মো. মাহবুব উর রহমান, রিজওয়ান দাউদ সামস, প্রীতি চক্রবর্তী এবং শ্রমিক নেত্রী তাসলিমা আখতার।





