কষ্ট কমাতে স্পর্শের বিকল্প নেই, নিঃসঙ্গ জীবনে কীভাবে মিলবে মানসিক স্বস্তি

মানুষ স্বভাবতই সামাজিক প্রাণী। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ও যান্ত্রিক জীবনযাত্রার কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে মানবিক সংযোগ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবেগ প্রকাশের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্যও ‘স্পর্শ’ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর একটি।
কষ্টের মুহূর্তে প্রিয়জনের আলতো স্পর্শ, কাঁধে হাত রাখা কিংবা একটি আলিঙ্গন মানুষের মনে তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনে দেয়। এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও। মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মানবিক স্পর্শ শরীর ও মনের ওপর গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জন্ম থেকেই স্পর্শের প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের পর থেকেই মানুষের বেঁচে থাকা ও বিকাশের সঙ্গে স্পর্শ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নবজাতক শিশুর ক্ষেত্রে মায়ের উষ্ণ স্পর্শ শরীরের তাপমাত্রা, হৃৎস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু পর্যাপ্ত মানবিক স্পর্শ পায় না, তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে স্পর্শ শুধু আবেগ নয়, মানুষের সুস্থ বিকাশেরও অপরিহার্য অংশ।
‘ভালোবাসার হরমোন’ বাড়ায় স্পর্শ
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, কাউকে আলিঙ্গন করা, হাত ধরা কিংবা আন্তরিকভাবে স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে অক্সিটোসিন নামের একটি হরমোন নিঃসৃত হয়। এটি ‘ভালোবাসার হরমোন’ নামেও পরিচিত।
এই হরমোন মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধ ও আত্মিক সংযোগ তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপে থাকা অবস্থায় প্রিয় কারও হাত ধরলে মস্তিষ্ক দ্রুত শান্ত হয়ে আসে। এমনকি কোনো সহানুভূতিশীল অপরিচিত ব্যক্তির স্পর্শও একই ধরনের প্রশান্তি দিতে পারে।
স্পর্শহীনতায় বাড়ে মানসিক ও শারীরিক ঝুঁকি
দীর্ঘদিন মানবিক স্পর্শ থেকে দূরে থাকলে শরীর ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। স্পর্শের অভাবে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে সহজেই বিভিন্ন সংক্রমণ ও অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
এ ছাড়া বিষণ্নতা, উৎকণ্ঠা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও আচরণগত রুক্ষতার সঙ্গেও স্পর্শহীনতার সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত আলিঙ্গন বা স্নেহপূর্ণ স্পর্শ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখে। বিপরীতে দীর্ঘদিন স্পর্শবঞ্চিত থাকলে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সম্পর্ক ও কর্মক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, স্পর্শ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত করতেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। যে দলের খেলোয়াড়েরা পরস্পরকে বেশি হাই-ফাইভ দেন বা আলিঙ্গন করেন, তাদের পারফরম্যান্স তুলনামূলক ভালো হয়।
শিক্ষাজীবনেও এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীর কাঁধে আলতো হাত রেখে উৎসাহ দিলে তার আত্মবিশ্বাস ও শেখার আগ্রহ বাড়ে। এমনকি রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ ও আলতো স্পর্শ গ্রাহকের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া বাড়ায় বলেও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
নিঃসঙ্গ জীবনে কী হতে পারে বিকল্প
যাদের জীবনে প্রিয়জনের উপস্থিতি কম, তারা কিছু উপায়ে স্পর্শের অভাব আংশিকভাবে কাটিয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ম্যাসাজ থেরাপি শরীরের পেশি ও স্নায়ুকে শিথিল করে মানসিক প্রশান্তি দিতে পারে। পোষা প্রাণী—বিশেষ করে বিড়াল বা কুকুরকে আদর করা কিংবা কোলে নেওয়াও শরীরে ইতিবাচক হরমোন নিঃসরণে সহায়তা করে।
এ ছাড়া ঘুমানোর সময় ভারী কম্বল ব্যবহার করলে শরীরে আলতো চাপ তৈরি হয়, যা অনেকটা আলিঙ্গনের অনুভূতির মতো কাজ করে। গরম পানিতে গোসল, হারবাল চা পান কিংবা নিজেকে নিজে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরার মতো অভ্যাসও মানসিক স্বস্তি এনে দিতে পারে।
সম্মতির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, মানবিক স্পর্শের ক্ষেত্রে ‘সম্মতি’ বা কনসেন্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারও ব্যক্তিগত সীমারেখা অতিক্রম করে কোনো স্পর্শ কখনোই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না। তাঁদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে প্রিয়জনকে সময় দেওয়া, হাতে হাত রাখা কিংবা আন্তরিকভাবে পাশে দাঁড়ানোর মতো ছোট ছোট মানবিক আচরণই মানুষকে মানসিকভাবে আরও সুস্থ ও সংযুক্ত রাখতে পারে।






