ঢাকার ট্রাফিকে এআইয়ের জাদু, পর্যায়ক্রমে বসবে সব সিগন্যালে

রাজধানীর সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি। কয়েক দিন আগেও যেখানে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশকে রীতিমতো ছুটে বেড়াতে হতো, সেখানে এখন অনেক মোড়ে লালবাতি জ্বলার সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ম মেনে থেমে যাচ্ছে যানবাহন। এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে এআই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা ব্যবস্থা।
গত বুধবার রাত ৯টার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজার মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, চারমুখী এ সড়কে তিনটি দিকের যানবাহন সিগন্যাল মেনে অপেক্ষা করছে, আর নির্দিষ্ট একটি দিক দিয়ে চলাচল করছে গাড়ি। কিছু সময় পর সিগন্যাল পরিবর্তন হতেই গাড়িগুলো নিয়ম মেনে স্টপ লাইনের মধ্যেই থেমে যায়।
ট্রাফিক পুলিশ বলছে, এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা বসানোর পর থেকেই এমন ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে।
বর্তমানে রাজধানীর ৩০টি মোড় বা ক্রসিংয়ে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহন শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানার আওতায় আনা হচ্ছে। ফলে আইন মানার প্রবণতাও বাড়ছে।
কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ছোটন বড়ুয়া বলেন, আগে গাড়ি থামাতে অনেক কষ্ট করতে হতো। এখন সিগন্যাল লাল হলেই বেশিরভাগ যানবাহন থেমে যাচ্ছে। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশা এখনো কিছুটা সমস্যা তৈরি করছে।
৭ মে থেকে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ গত ৭ মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে। ট্রাফিক আইন ভঙ্গ শনাক্ত করার জন্য বিশেষ সফটওয়্যারযুক্ত ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের নম্বর শনাক্ত করছে এবং মালিকের তথ্য সংগ্রহ করে ডিজিটাল মামলা দেওয়া হচ্ছে।
গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে এই সফটওয়্যারের উদ্বোধন করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির। এরপর ৩ মে চালক ও গাড়ির মালিকদের সতর্ক করে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
চালকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া
রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল এলাকায় মাইক্রোবাসচালক মো. মহিউদ্দিন বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ভালো। তবে অনেক সময় লালবাতি জ্বলে থাকলেও ট্রাফিক সদস্যরা গাড়ি চলাচলের নির্দেশ দেন। এমন পরিস্থিতিতে মামলা হবে কি না, তা নিয়ে চালকদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা রয়েছে।
যেভাবে কাজ করছে প্রযুক্তি
ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘পিটিজেড’ বা ‘প্যান-টিল্ট-জুম’ প্রযুক্তির উন্নতমানের ক্যামেরা। এই ক্যামেরা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে ভিডিও ও ছবি ধারণ করতে পারে এবং চলমান বস্তু অনুসরণ করতে সক্ষম।
উন্নত জুম সুবিধার মাধ্যমে দূর থেকেও স্পষ্টভাবে নম্বরপ্লেট শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, প্রতিটি ক্যামেরার দাম ৬০ হাজার টাকারও বেশি।
প্রাথমিকভাবে সফটওয়্যারে ছয় ধরনের আইন লঙ্ঘনের নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে। এসব তথ্য ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের সার্ভারে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সফটওয়্যারটির সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সার্ভারও যুক্ত রয়েছে। ফলে যানবাহনের নম্বর দিয়েই মালিকের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
৫০০ ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা
ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে ৩০টি মোড়ে এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। আগে থাকা ৮০টি ক্যামেরাকেও এআই প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। বর্তমানে মোট ১১০টি ক্যামেরার তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
পর্যায়ক্রমে রাজধানীর সব সিগন্যাল বাতির খুঁটিতে এ ধরনের ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০০টিতে নেওয়া হবে। বর্তমানে মহাখালী বাস টার্মিনাল এলাকায় নতুন ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে।
১৩ দিনে ৫৪৮টি মামলা
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিটি চালুর পর ১৩ দিনে প্রায় ১২ হাজার ভিডিও ফুটেজ সার্ভারে জমা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে এখন পর্যন্ত ৫৪৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে।
উল্টো পথে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল অমান্য, স্টপ লাইন অতিক্রম, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, অবৈধ পার্কিং ও যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার মতো অপরাধগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আগামীতে গণপরিবহনে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, প্রাইভেট কারে সিটবেল্ট ব্যবহার না করা এবং মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট না পরার বিষয়ও নজরদারির আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে ডিএমপি।
মুঠোফোনে যাবে মামলার তথ্য
বর্তমানে আইন ভঙ্গের তথ্য ডাকযোগে পাঠানো হলেও শিগগিরই মুঠোফোনে তা পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে আইন ভঙ্গের কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও সংযুক্ত করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, আইন ভাঙলে চালকের লাইসেন্সে ডিমেরিট পয়েন্ট যুক্ত হবে। নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলে লাইসেন্স বাতিলের ঝুঁকিও থাকবে।
চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। নিবন্ধনবিহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অস্পষ্ট নম্বরপ্লেটযুক্ত যানবাহন শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়ছে কর্তৃপক্ষ।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, ঈদুল আজহার পর নিবন্ধনবিহীন এবং অস্পষ্ট নম্বরপ্লেট ব্যবহারকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানো হবে।
‘এটাই শেষ ওষুধ’
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে আনতে এআই প্রযুক্তি এখন সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই উদ্যোগ ব্যর্থ হলে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। তবে শতভাগ সুফল পেতে প্রযুক্তির পাশাপাশি নীতিগত পরিবর্তনও জরুরি। অনুমোদনহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।





