মধ্যযুগীয় মসজিদকে মন্দিরের স্বীকৃতি, ভারতে ধর্মীয় রাজনীতির নতুন বিতর্ক

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধার শহরের ঐতিহাসিক ‘কামাল মাওলা মসজিদ’ ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। আদালতের এক রায়ের পর মধ্যযুগীয় এই স্থাপনাকে হিন্দুদের মন্দিরস্থল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকেই সেখানে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড শুরু করেছেন হিন্দু উপাসকেরা। ঘটনাটি দেশটির ধর্মীয় সহাবস্থান, ইতিহাস এবং রাজনীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
৭৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ রফিকের কাছে কামাল মাওলা মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং জীবনের অংশ ছিল। প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি সেখানে মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরও আগে তাঁর দাদা হাফিজ নাজিরুদ্দিন মসজিদটিতে ইমামতি করতেন।
তবে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ধার শহরের ভোজশালা কমপ্লেক্সে অবস্থিত এই মসজিদ বর্তমানে মুসলিমদের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে করা এক আবেদনে দাবি করা হয়, ঐতিহাসিক এ স্থাপনায় মসজিদের আগে একটি হিন্দু মন্দির ছিল। শুনানি শেষে আদালত রায়ে বলেন, মধ্যযুগে নির্মিত এই কমপ্লেক্স মূলত এক হিন্দু দেবীর উদ্দেশে উৎসর্গ করা হয়েছিল।
রায়ের পর থেকেই ভোজশালা কমপ্লেক্সে গেরুয়া পতাকা টানানো হয় এবং সেখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন শুরু হয়। বিপুল পুলিশ মোতায়েনের মধ্যে স্থাপন করা হয় দেবীর অস্থায়ী মূর্তি। ধর্মীয় সংগীত, আচার-অনুষ্ঠান এবং জনসমাগমের মধ্য দিয়ে এলাকাটি নতুন রূপ নেয়।
ভারতে পুরোনো মসজিদকে মন্দির দাবি করে বিতর্কের ঘটনা নতুন নয়। বিশেষ করে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসার পর এ ধরনের দাবি আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
এমনকি বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত স্থাপনা তাজমহল নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। যদিও এটি কোনো মসজিদ নয়, বরং একটি সমাধিসৌধ, তারপরও এর নিচে মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে—এমন দাবিও বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে।
ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকে বলেন, বর্তমানে ভারতে বিভিন্ন মসজিদকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং এটি হিন্দু জাতীয়তাবাদের মধ্যে বিদ্যমান ইসলামভীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতা সীমিত করতে এবং তাদের ওপর চাপ তৈরির কৌশলের অংশ হিসেবেও এ ধরনের পদক্ষেপকে অনেকে দেখছেন।
কামাল মাওলা মসজিদ বা ভোজশালা কমপ্লেক্স নিয়ে বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে প্রথম এ স্থানের ওপর দাবি তোলে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো।
২০০৩ সালে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে হওয়া এক সমঝোতা অনুযায়ী, প্রতি মঙ্গলবার হিন্দুরা স্থানটি পরিদর্শন করতে পারতেন এবং মুসলিমরা শুক্রবার সেখানে নামাজ আদায় করতেন।
তবে নতুন রায়ে এ স্থাপনাকে ‘বাগদেবী’ বা জ্ঞান ও বাণীর দেবীর মন্দির হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে হিন্দুরা সেখানে পূজার অধিকার পেয়েছেন, অন্যদিকে মুসলিমদের দাবি খারিজ হয়ে গেছে।
যদিও আদালত মুসলিমদের জন্য বিকল্প স্থানে মসজিদ নির্মাণের সুযোগ রাখার কথা বলেছেন, তবুও মুসলিমপক্ষ এ রায়ের বিরুদ্ধে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
মুসলিমপক্ষের আইনজীবী আশহার ওয়ারসি বলেন, এ রায় প্রতিষ্ঠিত আইনি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, ভারতের ‘উপাসনালয় আইন, ১৯৯১’ অনুযায়ী স্বাধীনতার সময় যে উপাসনালয়ের ধর্মীয় পরিচয় ছিল, তা পরিবর্তন করা যাবে না।
এদিকে হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি রায়ের সমালোচনা করে বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আরও বহু উপাসনালয় নিয়ে একই ধরনের বিতর্ক সামনে আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অযোধ্যার বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের পর থেকে ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে নতুন দাবি এবং আইনি লড়াইয়ের প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে।
তাঁদের মতে, ইতিহাস, ধর্মীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নে ভারতের বর্তমান বাস্তবতায় এসব ঘটনা শুধু আইনি বিতর্ক নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে।






