পা ফোলার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে লিম্ফেডেমা, কেন হয় এবং কী করণীয়

শরীরের কোনো অংশ, বিশেষ করে হাত বা পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেলে সেটিকে অনেকেই সাধারণ সমস্যা হিসেবে এড়িয়ে যান। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর অন্তর্নিহিত রোগেরও ইঙ্গিত হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি অবস্থার নাম হলো লিম্ফেডেমা। এটি এমন একটি সমস্যা, যেখানে শরীরের লসিকা বা লিম্ফ নামের স্বচ্ছ তরল স্বাভাবিকভাবে বের হতে না পেরে টিস্যুর ভেতরে জমা হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে ফোলা তৈরি করে।
কেন হয় লিম্ফেডেমা
আমাদের শরীরে রক্তনালির পাশাপাশি অত্যন্ত সূক্ষ্ম লসিকা নালির একটি জটিল ব্যবস্থা রয়েছে। এর কাজ হলো অতিরিক্ত তরল, প্রোটিন এবং জীবাণু বহন ও নিষ্কাশন করা। কোনো কারণে এই লসিকা প্রবাহে বাধা তৈরি হলে লিম্ফেডেমা দেখা দেয়।
কখন দেখা দিতে পারে
জন্মগত কারণে:
কিছু মানুষের জন্ম থেকেই লসিকা নালি কম থাকে অথবা স্বাভাবিকের তুলনায় দুর্বল থাকে। এ ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধি কিংবা প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে ধীরে ধীরে ফোলা শুরু হতে পারে।
পরবর্তী সময়ে:
কিছু অস্ত্রোপচারের পরও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় বগলের লসিকাগ্রন্থি অপসারণের পর অনেকের হাতে ফোলা দেখা যায়।
এ ছাড়া রেডিওথেরাপি, বারবার সংক্রমণ, বিশেষ করে ফাইলেরিয়াসিস, বড় ধরনের আঘাত অথবা দীর্ঘ সময় অচল অবস্থায় থাকলেও লিম্ফেডেমা হতে পারে।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
লিম্ফেডেমার ক্ষেত্রে সাধারণত হাত বা পা ধীরে ধীরে ফুলতে শুরু করে। আক্রান্ত স্থানে ভারী অনুভূতি বা টানটান ভাব তৈরি হতে পারে। ত্বক মোটা ও শক্ত হয়ে যেতে পারে। আঙুলের আংটি বা জুতা আগের তুলনায় আঁটসাঁট লাগতে পারে।
শুরুর দিকে ফোলা স্থানে চাপ দিলে দাগ থেকে যেতে পারে, তবে সময়ের সঙ্গে সেটি শক্ত হয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি ত্বকে বারবার সংক্রমণ, লালচে ভাব, গরম অনুভব হওয়া এবং ব্যথার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসায় যত দ্রুত, ফল তত ভালো
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিম্ফেডেমার চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা গেলে ভালো ফল পাওয়া যায়। দেরি হলে শরীরে স্থায়ী পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো ফোলা কমানো, সংক্রমণ প্রতিরোধ করা এবং রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা।
কমপ্রেশন থেরাপি
এ ক্ষেত্রে ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ, কমপ্রেশন স্লিভ বা বিশেষ ধরনের লম্বা মোজা ব্যবহার করা হয়। সকালে এগুলো ব্যবহার করা এবং নিয়মিত পরা গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক মাপ অনুসারে ব্যবহার করতে হয়। কমপ্রেশন ব্যবহারের পাশাপাশি হালকা ব্যায়াম করলে লসিকা প্রবাহ বাড়তে সাহায্য করে।
বিশেষ ম্যাসাজ পদ্ধতি
প্রশিক্ষিত থেরাপিস্ট হালকা চাপের মাধ্যমে জমে থাকা লিম্ফ তরল অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এটি সাধারণত ব্যথাহীন একটি পদ্ধতি।
ব্যায়াম
হাত ওপরে তুলে ধীরে নামানো, গোড়ালি নাড়ানো কিংবা হালকা হাঁটার মতো ব্যায়াম উপকারী হতে পারে। তবে ব্যায়াম জোর করে নয়, ধীরে ও নিয়মিত করতে হবে।
ত্বকের যত্ন
ত্বক সব সময় পরিষ্কার ও শুকনা রাখা প্রয়োজন। কাটা-ছেঁড়া এড়িয়ে চলা এবং মশা বা পোকামাকড়ের কামড় থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।
ওজন নিয়ন্ত্রণ
অতিরিক্ত ওজন লিম্ফেডেমার সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নিউম্যাটিক কমপ্রেশন পাম্প বা বিশেষ ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এটি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়।
দৈনন্দিন জীবনে যা করবেন
আক্রান্ত হাত বা পা উঁচু করে বিশ্রাম নিন। দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা এড়িয়ে চলুন। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন এবং ঢিলেঢালা আরামদায়ক পোশাক পরুন।
সম্ভব হলে আক্রান্ত হাতে রক্তচাপ মাপা, ইনজেকশন বা স্যালাইন দেওয়া এবং ভারী জিনিস তোলা এড়িয়ে চলুন। পাশাপাশি অতিরিক্ত গরম সেঁক না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।





