জামায়াত জোট ছাড়তে ধর্মভিত্তিক চার দলের ওপর হেফাজতের চাপ

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট থেকে সরে আসতে ধর্মভিত্তিক চারটি দলের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে হেফাজতে ইসলাম—এমন তথ্য জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। নির্বাচনের পরও এই চাপ অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে দলগুলোর নেতাদের জানানো হয়েছে, জামায়াতের জোট কিংবা হেফাজত—দুইয়ের মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট চার দলের নেতারা জানিয়েছেন, তারা একই সঙ্গে রাজনৈতিক জোট ও হেফাজতের সঙ্গে থাকতে চান। তাদের যুক্তি, কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক যেসব রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে হেফাজতের অংশ হিসেবে থাকতে পারে, তাহলে তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থান নেওয়ার কারণ নেই।
দলীয় সূত্র ও হেফাজতের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কওমিভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং মহাসচিব সাজিদুর রহমান জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদীর মতাদর্শের সমালোচনা করেছিলেন। তারা জামায়াতকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়ে দলটির পক্ষে ভোট না দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। এমনকি হেফাজতের পক্ষ থেকে জামায়াত-সমর্থিত জোটকে ভোট দেওয়া হারাম বলেও বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল।
তবে হেফাজতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ খেলাফত, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন এবং নেজামে ইসলাম পার্টি বর্তমানে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের অংশ।
বাংলাদেশ খেলাফতের আমির মামুনুল হক হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে এসব দলের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা হেফাজতের বিভিন্ন পদে রয়েছেন। ফলে রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংগঠনিক সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
অন্যদিকে হেফাজত-ঘনিষ্ঠ জমিয়ত উলামায়ে ইসলামের দুটি অংশ বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। ইসলামী ঐক্যজোটও বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তবে তাদের ক্ষেত্রে হেফাজতের পক্ষ থেকে কোনো চাপ দেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জামায়াত জোটে থাকা চারটি দলের একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা হেফাজত এবং রাজনৈতিক জোট—উভয় ক্ষেত্রেই থাকতে চান। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে হেফাজতের অবস্থান বিএনপির প্রতি বেশি অনুকূল হয়ে উঠেছে। তবে তারা হেফাজত থেকে সরে যাওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিবর্তনের চেষ্টা করবেন।
নির্বাচনের পরও অব্যাহত চাপ
জামায়াতের সঙ্গে একসময় রাজনৈতিক সমন্বয়ে থাকা চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনও সম্প্রতি আবার দলটির সমালোচনায় সরব হয়েছে। যদিও দলটি সরাসরি হেফাজতের সঙ্গে যুক্ত নয়, তবে জামায়াতের বিষয়ে তাদের বক্তব্যে কিছুটা মিল দেখা যাচ্ছে।
জানা গেছে, গত ২৮ এপ্রিল চারটি দলের সঙ্গে আলোচনা চালাতে একটি কমিটি গঠন করে হেফাজত। হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরীর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দলগুলোর সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেছে কমিটি।
এদিকে এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গুঞ্জন ছড়ায় যে, জামায়াতের জোট না ছাড়লে সংশ্লিষ্ট নেতাদের হেফাজত থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে।
এসব আলোচনার মধ্যেই রোববার চট্টগ্রামের জামিয়া ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মামুনুল হক। বৈঠক শেষে শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দাবি করেন, হেফাজতের ভেতরে কোনো বিভেদ নেই।
মামুনুল হক বলেন, হেফাজতের বিশ্বাস, আকিদা ও নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে বাংলাদেশ খেলাফতসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলো একমত। তিনি বলেন, বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য ১১ দলীয় ঐক্য গঠন করা হয়েছে। এটি আদর্শিক নয়, বরং রাজনৈতিক ঐক্য।
হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব এবং বাংলাদেশ খেলাফতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন বলেন, হেফাজত একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবেই কাজ করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। তিনি বলেন, সংগঠনের নেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
জোট ছাড়ার প্রশ্নে আপত্তি
রোববারের বৈঠকে খেলাফত মজলিসের অপর অংশ, নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলনকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা সরাসরি অংশ নেয়নি। তাদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন মামুনুল হক।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা বলেন, জামায়াতকে ঘিরে হেফাজতের বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে তারা নীতিগতভাবে একমত নন। তাদের যুক্তি, অতীতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটেও জামায়াত ছিল এবং তখন এই প্রশ্ন ওঠেনি। এখন নতুন করে আপত্তির কারণ তারা দেখছেন না।
জামায়াতের সঙ্গে থাকা খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ডা. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, হেফাজত একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন। কোনো রাজনৈতিক দল কার সঙ্গে জোট করবে, সেটি সংশ্লিষ্ট দলের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
এদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়কারী হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, কোনো দলই জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। বরং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সংস্কারের লক্ষ্য সামনে রেখে জোট আরও শক্তিশালী হচ্ছে।





