জুলাইয়ের ৭৯৮ মামলায় ৫ হাজার ৭৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মামলার তদন্তে পাঁচ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে হয়রানিমূলকভাবে আসামি করা হয়েছিল বলে তথ্য উঠে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে ৭৯৮টি মামলায় মোট ৫ হাজার ৭৪ জনকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ।
একই সঙ্গে অন্তত ৪০টি মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদনও দাখিল করা হয়েছে। তদন্ত শেষে কোনো মামলায় পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়া গেলে অথবা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে পুলিশ আদালতে যে প্রতিবেদন দেয়, তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া গত ১৬ মে পর্যন্ত জুলাই-সংশ্লিষ্ট ১৭৫টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে মোট আসামির সংখ্যা ১৩ হাজার ৮২৪ জন।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতদের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় মোট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে ৭৯৯টি হত্যা মামলা এবং হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারায় মামলা রয়েছে ১ হাজার ৫৬টি।
অভিযোগপত্র জমা দেওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ৪৯টি হত্যা মামলা। এসব মামলায় মোট ৪ হাজার ৭২৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৭১ জন এজাহারভুক্ত এবং তদন্তের মাধ্যমে নতুনভাবে ১ হাজার ৪৫২ জনের নাম উঠে এসেছে। এছাড়া হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারার ১২৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, যেখানে মোট আসামির সংখ্যা ৯ হাজার ১০১ জন।
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থাকে হয়রানিমুক্ত ও আরও জনবান্ধব করতে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮–এ ধারা ১৭৩ (এ) যুক্ত করা হয়েছিল। এই ধারার আওতায় কোনো ব্যক্তির নাম হয়রানিমূলকভাবে এফআইআরে অন্তর্ভুক্ত হলে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দিতে পারেন এবং আদালত তা বিবেচনা করে অভিযুক্তকে অব্যাহতি দিতে পারেন।
এই আইনি ব্যবস্থার আওতায় ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন থানার ৩৫৪টি মামলায় ৩ হাজার ৮৪৯ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া সিলেট মহানগরে ৩৯টি মামলায় ১৪৪ জন, চট্টগ্রামে ১৯টি মামলায় ৫২ জন, গাজীপুরে ১২টি মামলায় ২১ জন, রাজশাহীতে ১০টি মামলায় ২৫ জন, বরিশালে ৩টি মামলায় ৬ জন, খুলনায় ১টি মামলায় ৫ জন এবং রংপুরে ২টি মামলায় ৬ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
জেলা পর্যায়েও একই ধরনের সুপারিশ এসেছে। ঢাকা রেঞ্জের ২১১টি মামলায় ৪৮৫ জন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ৩৪টি মামলায় ৯৫ জন, খুলনা রেঞ্জের ২৮টি মামলায় ৫৮ জন, রংপুর রেঞ্জের ৫টি মামলায় ৮ জন, রাজশাহী রেঞ্জের ১২টি মামলায় ২৮ জন, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ১৮টি মামলায় ৬০ জন, বরিশাল রেঞ্জের ২টি মামলায় ১৭ জন এবং সিলেট রেঞ্জের ২০টি মামলায় ১৪০ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্তে ধারাবাহিক অগ্রগতি হচ্ছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি রোধ এবং তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
৬১ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে প্রমাণ পায়নি পিবিআই
জুলাই-সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ৮৫৫টি মামলার মধ্যে ৭৭টির তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশে ১৯৫টি সিআর মামলার তদন্তও শুরু করে সংস্থাটি। সব মিলিয়ে ২৭২টি মামলার তদন্ত করে পিবিআই, যার মধ্যে ৮৪টি হত্যা মামলা এবং ১৮৮টি অন্যান্য ধারার মামলা রয়েছে।
গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ১৬৫টি মামলার তদন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৪২টি হত্যা মামলা এবং ১২৩টি অন্যান্য ধারার মামলা রয়েছে। বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে আরও ১০৭টি মামলা।
তদন্তে নিষ্পত্তি হওয়া ১৬৫টি মামলার মধ্যে ১১১টিতে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে, যা মোটের ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ। এসব মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩১টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া ১১১টি মামলায় এজাহারভুক্ত মোট ৯ হাজার ৬৯১ জন আসামির মধ্যে ৬১ দশমিক ১ শতাংশের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পূর্বশত্রুতা, প্রতিশোধ কিংবা মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে অনেক ব্যক্তিকে এসব মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এমন ব্যক্তির নামও আসামির তালিকায় ছিল, যারা ঘটনার সময় ঢাকায় অবস্থানই করেননি।
পৃথক মামলায় ১৯৭ জনের মধ্যে ৩৮ জনের সংশ্লিষ্টতা
জুলাই অভ্যুত্থানের আরেকটি মামলায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের বাসিন্দা মুদি ব্যবসায়ী মো. জামাল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ১৯৭ জনকে আসামি করা হয়।
পিবিআই তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলেও অভিযুক্ত ১৯৭ জনের মধ্যে মাত্র ৩৮ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। বাকি ১৫৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। এ কারণে সংশ্লিষ্ট ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) আবু ইউসুফ বলেন, বর্তমানে তদন্তাধীন ১০৭টি মামলার প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রের অনুমতি, চিকিৎসা সংক্রান্ত সনদ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে কিছু বিলম্ব হচ্ছে। তবে দ্রুতই বাকি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।






