‘বড় দল’ হওয়ার পথে শৃঙ্খলা সংকটে জামায়াত, বাতিল দুই জেলা কমিটি

দীর্ঘদিন ধরে কঠোর সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য পরিচিত জামায়াতে ইসলামী এখন নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বৃদ্ধি এবং নির্বাচনী সাফল্যের পর দলটির অভ্যন্তরে নেতৃত্ব ও প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে সাংগঠনিক নিয়ম ভঙ্গ, বিদ্রোহী প্রার্থিতা এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধের ঘটনাও সামনে আসছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের পর জামায়াতের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। অনেক নতুন ব্যক্তি দলে যুক্ত হতে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তবে এই প্রবণতা দলটির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় কঠোর অবস্থান
দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘটনায় ইতোমধ্যে কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জ ও নরসিংদী জেলা কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামেও দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগে একজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ময়মনসিংহের এক নেতাকেও বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব যোবায়ের বলেন, দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। শৃঙ্খলা রক্ষার বার্তা দিতেই সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটি বাতিল করা হয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আদর্শভিত্তিক দল থেকে গণভিত্তিক দলে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্যাডারভিত্তিক ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে থাকা জামায়াত এখন বৃহত্তর রাজনৈতিক দলে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে। এর ফলে নতুন সমর্থক ও কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবু সাঈদ খান মনে করেন, দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে দলটির ভেতরে নেতৃত্ব ও নির্বাচনী পদ পাওয়ার প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে দলীয় অনুশাসন ভঙ্গ এবং বিদ্রোহী অবস্থানের ঘটনাও বাড়ছে।
তার মতে, জামায়াত যদি আগের মতো সীমিত আদর্শিক কাঠামোয় থাকে, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা কঠিন হবে। আবার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটালে শৃঙ্খলা ও আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে।
স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরেও উদ্বেগ
দলীয় নেতাদের মতে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে তৎপরতা বাড়ছে। কোথাও কোথাও দলীয় অনুমোদনের আগেই প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালানোর অভিযোগও উঠেছে।
তবে জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আবদুল হালিম জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ায় আনুষ্ঠানিক মনোনয়নের সুযোগ না থাকলেও দল একজন প্রার্থীকে সমর্থন দেবে। সেই সিদ্ধান্তের বাইরে গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নতুন বাস্তবতায় সাংগঠনিক চাপ
জামায়াতের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনে সাফল্যের পর দলকে ঘিরে নতুন ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। অতীতে যারা দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন না, তাদের মধ্যেও এখন নেতৃত্ব ও জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, অনেক এলাকায় নির্বাচনী সাফল্যের কারণে সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতাদের ঘিরে নতুন বলয় তৈরি হয়েছে। এতে ঐতিহ্যগত সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে নতুন প্রভাবক গোষ্ঠীর উত্থান ঘটছে, যা ভবিষ্যতে শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দলীয় কাঠামো ও প্রার্থী নির্বাচনের নিয়ম
জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেউ সরাসরি দলীয় পদ বা নির্বাচনী প্রার্থিতা দাবি করতে পারেন না। দলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয় এবং প্রার্থী নির্ধারণেও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে কোনো সদস্য নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করতে বা ভোট চাইতে পারেন না। গোপন ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয় এবং দলীয় অনুমোদন ছাড়া নির্বাচনী প্রচারণাও সাংগঠনিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
‘বড় দল’ হওয়ার পথে ভারসাম্যের পরীক্ষা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াত বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বৃদ্ধি এবং ক্ষমতার রাজনীতিতে বড় ভূমিকা রাখার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের আদর্শিক ও শৃঙ্খলাভিত্তিক কাঠামো—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন দলটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এ বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, মানুষের মধ্যে নেতৃত্ব বা পদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে পারে। তবে দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, “শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজন হলে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাতে জামায়াত যদি তথাকথিত অর্থে বড় দল না-ও হতে পারে, তবু দল তার সাংগঠনিক নীতির সঙ্গে আপস করবে না।”





