তৃণমূল থেকে মমতার ‘অপসারণ’, বিদ্রোহীদের নতুন কমিটি ঘোষণা

সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই দলীয় সংকটে থাকা পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার আরও বড় ধাক্কার মুখে পড়লেন। বিদ্রোহী শিবিরের উদ্যোগে তাকে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস থেকে কার্যত অপসারণ করে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার বিকেলে কলকাতার নিউটাউন এলাকার একটি হোটেলে বৈঠক শেষে এ তথ্য জানান বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তার নেতৃত্বে এবং বিধায়ক অরূপ রায়ের সমর্থনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিদ্রোহীদের দাবি, বৈঠকে তৃণমূলের প্রায় ৬০ জন বিধায়ক এবং কলকাতার প্রায় ৭০ জন সাবেক কাউন্সিলর অংশ নেন। সেখানেই ৩০ সদস্যের নতুন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন কাঠামোয় চেয়ারম্যান করা হয়েছে অরূপ রায়কে এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়।
কমিটিতে রাজ্যপর্যায়ে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা ও সাবিনা ইয়াসমিন। এছাড়া প্রথম সহ-সভাপতি করা হয়েছে সাবেক মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে। সহ-সভাপতি পদে রাখা হয়েছে কলকাতার সাবেক মেয়র ফিরহাদ হাকিম ও জ্যেষ্ঠ বিধায়ক রথীন ঘোষকে। কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিদ্রোহীদের ওই বৈঠকে ব্যবহৃত ব্যানারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো ছবি ছিল না। সেখানে মহাত্মা গান্ধী, ভীমরাও আম্বেদকর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের ছবি স্থান পায়।
বৈঠক শেষে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দলের সংবিধান অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও ২০২২ সালের পর তা হয়নি। এই কারণ দেখিয়ে আগের কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, বিদ্রোহীদের এই পদক্ষেপের পর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। দলবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খান, অরূপ রায়, রথীন ঘোষ, সাবিনা ইয়াসমিনসহ সংশ্লিষ্ট নেতাদের শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের ভেতরে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। অভিযোগ ওঠে, বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এই অভিযোগকে ঘিরেই প্রথম প্রকাশ্যে বিদ্রোহের সূচনা করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহা।
ক্রমে এই ভাঙন তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ নেতাও বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দেন। এমনকি সংসদীয় দলেও প্রভাব পড়ে—একসঙ্গে একাধিক সাংসদ দলত্যাগ করেন বলে জানা যায়।
তবে বিদ্রোহীদের এই পদক্ষেপকে গুরুত্ব দিতে নারাজ মমতা-ঘনিষ্ঠ নেতারা। বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, “তৃণমূল আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমার্থক। দলের কাঠামো অনুযায়ী এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো এখতিয়ার বিদ্রোহীদের নেই।”
একই সুরে তৃণমূলের সাংসদ ও আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও বলেন, দলীয় সংগঠন ও পরিষদীয় দল এক বিষয় নয়; এ নিয়ে শেষ কথা বলবে আদালতই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে চলমান দ্বন্দ্বকে আরও প্রকট করে তুলেছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে—দলের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি বিদ্রোহী শিবিরের।





