৮৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি সত্ত্বেও রেকর্ড রাজস্ব আদায়ের পথে এনবিআর

ঢাকা, ২১ জুন: চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে না পারলেও দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছর শেষে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতে পারে, যদিও সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি থাকবে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
রোববার এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল আমিন শেখ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, জুন মাসের প্রথম ২০ দিনে ২৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরে মোট আদায়ের পরিমাণ ইতোমধ্যে গত অর্থবছরের পুরো বছরের রাজস্ব সংগ্রহকে ছাড়িয়ে গেছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুন পর্যন্ত মোট রাজস্ব আদায় দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা।
সংস্থাটি আশা করছে, জুনের বাকি ১০ দিনে আরও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায় সম্ভব হবে। সে ক্ষেত্রে অর্থবছর শেষে মোট রাজস্ব সংগ্রহের পরিমাণ ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। যদিও তা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম হবে।
এনবিআরের পরিসংখ্যান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে, অর্থাৎ মে ২০২৬ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ফলে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ০২ শতাংশ এবং অতিরিক্ত আদায় হয়েছে ৩২ হাজার ৮৫৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
তবে লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তুলনা করলে ঘাটতির চিত্রও স্পষ্ট। মে পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। ফলে ১১ মাস শেষে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা।
খাতভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কাস্টমস, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং আয়কর—এনবিআরের তিনটি প্রধান রাজস্ব উৎসেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে সম্প্রতি বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে এনবিআর। এর মধ্যে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগে পৃথক তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এসব টাস্কফোর্স আপিল, ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) প্রক্রিয়ায় আটকে থাকা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ে কাজ করছে।
এ ছাড়া কর ফাঁকি শনাক্তকরণ, স্বয়ংক্রিয় অডিট কার্যক্রম, উৎসে কর ও ভ্যাট আদায়ের তদারকি, পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট জোরদার, ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ করদাতাদের ওপর সমন্বিত অডিট কার্যক্রম রাজস্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে বলে দাবি করছে সংস্থাটি।
তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করছে, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের জন্য রাজস্ব আদায় বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে। ফলে চলতি অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায় হলেও আগামী বছর এনবিআরের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও রাজস্ব বিশেষজ্ঞরা।






