সাতক্ষীরায় ১২ গ্রামের মানুষের উদ্যোগে ১৪২তম ‘রাখালতলা মেলা’ অনুষ্ঠিত

মোঃ মোকাররাম বিল্লাহ ইমন সাতক্ষীরা।।
ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সর্বজনীন উৎসবের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী 'রাখালতলা মেলা'। সদর উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের পরানদহ ও আবাদেরহাট সংলগ্ন জগন্নাথপুর এলাকায় চলতি বছর ২০২৬ সালে মেলাটি সফলতার সাথে ১৪২তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। তিন দিনব্যাপী আয়োজিত এই উৎসবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের ঢল নামে, যা এই অঞ্চলকে এক মিলনমেলায় পরিণত করে।
স্থানীয় প্রবীণদের সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৪২ বছর আগে রাখাল চন্দ্র নামে এক ব্যক্তি কাদা দিয়ে একটি পুতুল বানিয়ে এই স্থানে পূজার সূচনা করেছিলেন। কালের পরিক্রমায় সেই ক্ষুদ্র আয়োজন আজ বিশাল এক উৎসবের রূপ নিয়েছে। মেলার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি প্রাচীন বটগাছ, যার আনুমানিক বয়স প্রায় ১৪৫ বছর। এই বটবৃক্ষের ছায়াতলে রাখালকে স্মরণ করেই প্রতি বছর এই মেলা ও পূজার আয়োজন করা হয়।
সনাতন ধর্মীয় প্রথা মেনে তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের প্রথম দিন ‘অধিবাস’ এর মধ্য দিয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে। দ্বিতীয় দিন অনুষ্ঠিত হয় মূল আকর্ষণ ‘বড় পূজা’। এই দিনে সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন প্রান্তসহ দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো ভক্ত এসে ভগবানের চরণে তাদের মনের বাসনা ও কামনা পূরণের প্রার্থনা জানান। উৎসবের শেষ দিনে ‘ভাঙ্গা বাজার’ বা সমাপনী মেলার মধ্য দিয়ে তিন দিনের এই মিলনমেলার সমাপ্তি ঘটে। মেলা উপলক্ষে হরেক রকমের খেলনা, কুটির শিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি-খাবারের দোকানে মুখরিত ছিল পুরো মেলা প্রাঙ্গণ।
এই মেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সর্বজনীনতা। স্থানীয় হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই উৎসব উদযাপন করেন। আশেপাশের ১২টি গ্রামের মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে দীর্ঘ বছর ধরে কোনো প্রকার ভেদাভেদ ছাড়াই এই মেলা পরিচালনা করে আসছেন। শুধু সাতক্ষীরাই নয়, এই মেলার সুখ্যাতি ওপার বাংলা তথা ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেখান থেকেও অনেক দর্শনার্থী এখানে আসেন।
মেলাটি যেন সম্পূর্ণ ঝামেলামুক্ত এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পরিচালিত হয়, সেজন্য মেলা কমিটি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিল। স্থানীয় ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিরা মেলাটি সফল করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
উৎসবে আগত বক্তারা বলেন, “এই মেলা প্রমাণ করে আমরা জাতিগতভাবে বিভক্ত নই; আমরা সবাই একে অপরের ভাই এবং বন্ধু। সাতক্ষীরায় সকল ধর্মের মানুষ অত্যন্ত শান্তিতে ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন। এখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর কোনো অত্যাচার বা আঘাতের নজির নেই। এমনকি ভারতের সরকারও বারবার স্বীকার করেছে যে, বাংলাদেশের এই অঞ্চলে হিন্দু সম্প্রদায় নিরাপদ ও শান্তিতে আছে।”
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, “আমাদের দেশনায়ক তারেক রহমানের স্পষ্ট বার্তা রয়েছে—কোনো অবস্থাতেই যেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট না হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের নিরাপত্তা দিতে আমরা বদ্ধপরিকর। যদি কেউ এই সম্প্রীতি ও নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করে, তবে তাকে কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা হবে।”
কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই অত্যন্ত আনন্দঘন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মেলার সমাপ্তি ঘটায় আয়োজক কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই মেলবন্ধন আগামীতেও অটুট থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।





