ভারতের নতুন টেক্সটাইল পার্কে বাড়তে পারে প্রতিযোগিতা, চাপে পড়ার আশঙ্কায় দেশের পোশাক খাত

ভারতের ওয়ারাঙ্গল জেলায় বিশাল পরিসরে নির্মাণ করা হয়েছে কাকাতিয়া মেগা টেক্সটাইল পার্ক। সম্প্রতি হায়দরাবাদ থেকে ভার্চুয়ালি এই বৃহৎ শিল্প প্রকল্পের উদ্বোধন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নতুন এই উদ্যোগকে দেশটির টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পের বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্যও নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে ভারতের কেন্দ্রীয় কয়লা ও খনি মন্ত্রী জি কিষাণ রেড্ডি জানিয়েছিলেন, এক হাজার ৩২৭ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই পার্ক নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় এক হাজার ৬৯৫ কোটি রুপি। তবে পুরো প্রকল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ছয় হাজার কোটি রুপির বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে তিন হাজার ৮০০ কোটিরও বেশি বিনিয়োগ এসেছে। পার্কের প্রায় ৬২ শতাংশ জমি বড় ও নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই শিল্প পার্ক ভারতের টেক্সটাইল উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে। ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, পার্কটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির শক্ত অবস্থানও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কারণ, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে। অন্যদিকে ভারতের নতুন টেক্সটাইল পার্ক দেশটির রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণে ভারত ধারাবাহিকভাবে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশটি একটি কার্যকর উদাহরণ তৈরি করেছে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার পাশাপাশি সেসব চুক্তির পূর্ণ সুবিধা নিতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও তারা সম্পন্ন করছে।
তিনি বলেন, ভারতের বড় একটি সুবিধা হলো কাঁচামাল উৎপাদনে সক্ষমতা। সুতার জন্য প্রয়োজনীয় তুলা দেশটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদিত হয়। ফলে তুলাভিত্তিক পণ্যে তাদের অবস্থান শক্তিশালী। পাশাপাশি উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা, সরকারি ভর্তুকি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য জমি বরাদ্দের মতো সুযোগও উদ্যোক্তাদের সহায়তা করছে।
মহিউদ্দিন রুবেলের ভাষ্য, ‘তাদের তুলানির্ভর কিছু পণ্যের মান তুলনামূলক কম হলেও অধিকাংশ বিদেশি ক্রেতা উৎপাদন পদ্ধতির চেয়ে মূল্যকে বেশি গুরুত্ব দেন। কম দামে পণ্য সরবরাহ করে ভারত প্রতিযোগিতায় ভালো অবস্থানে রয়েছে। শুল্ক ছাড় না থাকলেও আমরা হয়তো সেই দামে পণ্য দিতে পারব না। ভারত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। বাংলাদেশেরও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি বাস্তবায়নের দৃঢ় উদ্যোগ প্রয়োজন।’
প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে ২৪ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রায় দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পার্কের ১০ শতাংশ এলাকা সবুজায়নের আওতায় রাখা হয়েছে।
২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর কাকাতিয়া মেগা টেক্সটাইল পার্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। বর্তমানে এটি ভারতের অন্যতম বৃহৎ টেক্সটাইল শিল্পপার্ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘মিত্র’ কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত একটি ব্রাউনফিল্ড প্রকল্প।
ভারতের সবচেয়ে বেশি তুলা উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোর একটি ওয়ারাঙ্গল। তুলা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী শিল্পভিত্তি। একই সঙ্গে দক্ষ শ্রমশক্তি, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগও এই শিল্পায়নের বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রকল্পে তন্তু উৎপাদন থেকে শুরু করে পোশাক তৈরি এবং রপ্তানি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। হায়দরাবাদ বিমানবন্দর থেকে পার্কটির দূরত্ব প্রায় ১৯০ কিলোমিটার। এছাড়া ওয়ারাঙ্গলের পুরনো বিমানবন্দরটি ২০৩০ সালের মধ্যে পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যা রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘৫এফ’ ভিশন অনুসরণ করে গড়ে তোলা হচ্ছে এই প্রকল্প। এর মূল ধারণা হলো—খামার থেকে তন্তু, তন্তু থেকে কারখানা, কারখানা থেকে ফ্যাশন এবং ফ্যাশন থেকে বিদেশি বাজারে পৌঁছানো। এই সমন্বিত কাঠামো টেক্সটাইল খাতের পুরো মূল্যশৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে।





