বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নে, ত্রৈমাসিক তদারকির পরামর্শ হোসেন জিল্লুর রহমানের

ঢাকা, ২১ জুন: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। শুধু উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, বাস্তবে কতটুকু অগ্রগতি হচ্ছে তা নিয়মিত মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
শনিবার পিপিআরসি আয়োজিত ‘পিপিআরসির বাজেট বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে তিনি বলেন, যেকোনো বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এ কারণে বাজেট বাস্তবায়ন কৌশলকে সরকারের শাসন কাঠামোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ত্রৈমাসিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। এতে অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী পদক্ষেপ গ্রহণ সহজ হবে।
হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিতা ও প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ ছাড়া বাজেটের লক্ষ্য অর্জন কঠিন। তিনি বলেন, দুর্নীতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যর্থতা এবং অপ্রয়োজনীয় দপ্তর ও প্রকল্পজনিত প্রাতিষ্ঠানিক অপচয় দেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টার বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে বাজেটের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু সুরক্ষা নিশ্চিত করলেও মধ্যবিত্তের ওপর বাজেটের প্রভাব নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়নি। করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হলেও করহার বৃদ্ধির কারণে অনেক করদাতা প্রত্যাশিত সুবিধা নাও পেতে পারেন। একই সঙ্গে প্রান্তিক অঞ্চলের বৈষম্য হ্রাস, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ওয়েবিনারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ও স্বচ্ছতা ছাড়া উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি রাজস্ব প্রশাসনে প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নের গতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, উৎপাদনশীল খাত ও বেসরকারি উদ্যোগকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হলে রাজস্ব আহরণ স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।
নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, বাজেটের অনেক প্রক্ষেপণ দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। তিনি ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর ভাষ্য, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে আস্থা ফিরিয়ে আনতে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। অনেক তরুণকে একাধিক পেশায় যুক্ত হতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ ব্যয় সামাল দিতে খাবার গ্রহণও কমিয়ে দিচ্ছেন। তিনি রাজধানীর বাইরের অঞ্চলের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে নীতিনির্ধারণে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম. এ. সাত্তার মণ্ডল কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি স্মার্ট কৃষি ও প্রযুক্তিগত অভিযোজনের ওপর জোর দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অন্যদিকে মালালা ফান্ডের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ মুশাররফ তানসেন বলেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও তা শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল উন্নয়নে কতটা ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, শিক্ষা খাতের মূল চ্যালেঞ্জ বাজেটের আকার নয়; বরং সম্পদের কার্যকর ব্যবহার ও শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা।






