গরম করলেই খাবার ‘বিষ’ হয়? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ব্যস্ত জীবনে সময় বাঁচাতে এবং খাদ্যের অপচয় কমাতে অনেকেই আগের দিনের রান্না করা খাবার সংরক্ষণ করে পরে খেয়ে থাকেন। ফ্রিজে রাখা ভাত, মুরগির তরকারি কিংবা আলুর বিভিন্ন পদ এখন অনেক পরিবারের নিয়মিত অভ্যাসের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এসব খাবার পুনরায় গরম করে খাওয়া নিরাপদ কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে।
অনেকের ধারণা, কিছু খাবার দ্বিতীয়বার গরম করলেই তা বিষাক্ত হয়ে যায় বা খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে ভাত, ডিম, আলু কিংবা মুরগির মাংস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটে নানা ধরনের সতর্কবার্তা ঘুরে বেড়ায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা মূলত খাবারে নয়; বরং খাবার সংরক্ষণ ও ব্যবহারের পদ্ধতিতে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী সাগা-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সঠিক নিয়ম না মানলে কিছু খাবারে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ব্রিটিশ ডায়েটেটিক অ্যাসোসিয়েশনের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ গোয়ার জেমস বলেন, ‘যেকোনো খাবার থেকেই খাদ্যে বিষক্রিয়া হতে পারে। ভাত, মুরগি বা ডিম—এসব নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার। তবে সঠিকভাবে সংরক্ষণ, রান্না বা পুনরায় গরম না করলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
অর্থাৎ, ঝুঁকির বড় কারণ হলো অসতর্কতা। কয়েকটি সাধারণ নিয়ম মেনে চললে আগের দিনের খাবারও নিরাপদভাবে খাওয়া সম্ভব।
ভাত নিয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা
পুনরায় গরম করা খাবারের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় ভাত নিয়ে। অনেকেই মনে করেন, ভাত দ্বিতীয়বার গরম করলে বিষক্রিয়া হতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি গরম করায় নয়, বরং রান্নার পর ভাত কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান নারিমান লুচ বলেন, কাঁচা চালে ব্যাসিলাস সেরিয়াস নামের ব্যাকটেরিয়ার স্পোর থাকতে পারে। রান্নার পর দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দিলে সেখান থেকে ক্ষতিকর উপাদান তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তী গরম করলেও নষ্ট নাও হতে পারে।
তাই রান্না করা ভাত দ্রুত ঠান্ডা করে এক ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখা উচিত। এছাড়া বড় পাত্রের পরিবর্তে ছোট ভাগে ভাগ করে রাখলে দ্রুত ঠান্ডা হয়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, ভাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই খেয়ে ফেলা ভালো।
ফয়েলে মোড়ানো আলুতেও থাকতে পারে ঝুঁকি
ভাতের মতো আলোচনায় কম এলেও আলু থেকেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ফয়েলে মোড়ানো বেকড আলুর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
খাদ্যস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ র্যাচেল কিস বলেন, ফয়েলে মোড়ানো আলুর ভেতরে এমন পরিবেশ তৈরি হতে পারে যা ক্লস্ট্রিডিয়াম বটুলিনাম ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির জন্য উপযোগী। এ ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি হওয়া বিষাক্ত উপাদান অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।
তাই আলু রান্নার পর দ্রুত ফয়েল খুলে ফেলতে হবে এবং দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হবে।
মুরগির মাংস গরমে সমস্যা কোথায়?
মুরগির মাংস পুনরায় গরম করা নিয়েও অনেকের মধ্যে ভয় রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিকভাবে গরম করা হলে এতে সমস্যা নেই।
গোয়ার জেমস বলেন, ‘মুরগিসহ সব ধরনের মাংস পুনরায় গরম করা যায়, যদি পুরোটা সমানভাবে গরম হয়।’
যদি খাবারের কোনো অংশ গরম থাকে এবং অন্য অংশ ঠান্ডা থাকে, তাহলে ব্যাকটেরিয়া টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই গরম করার সময় মাংস নেড়ে দেওয়া বা বড় টুকরা ছোট করা ভালো।
ডিমও রাখা যায়, তবে নিয়ম মেনে
ডিমভিত্তিক খাবার গরম করে খাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন নানা ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির কারণে ডিমও যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও গরম করলে নিরাপদ।
ফ্রিটাটা, ডিমভাত বা ডিমযুক্ত অন্য খাবার দ্রুত ঠান্ডা করে সংরক্ষণ করা হলে পরে পুনরায় গরম করে খাওয়া যেতে পারে।
শুধু গন্ধ দিয়ে খাবার পরীক্ষা যথেষ্ট নয়
অনেকেই খাবার নষ্ট হয়েছে কি না তা গন্ধ শুঁকে বোঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এটিকে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে দেখছেন না।
নারিমান লুচের মতে, খাদ্যে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা স্পোর সবসময় গন্ধ কিংবা চেহারা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। অনেক সময় খাবার স্বাভাবিক দেখালেও তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তবে খাবারে ছত্রাক বা ফাঙ্গাস দেখা গেলে সেটি খাওয়া উচিত নয়।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় সংক্রমণের আশঙ্কাও বাড়ে।
নিরাপদে খাবার গরম করার কয়েকটি নিয়ম
দ্রুত ঠান্ডা করুন: রান্না করা খাবার এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখুন।
সঠিকভাবে সংরক্ষণ করুন: ফ্রিজের তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কম রাখুন এবং বায়ুরোধী পাত্র ব্যবহার করুন।
সময়ের মধ্যে খেয়ে ফেলুন: অধিকাংশ খাবার দুই দিনের মধ্যে খাওয়া ভালো, তবে ভাত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেষ করা উচিত।
পুরোপুরি গরম করুন: খাবার এমনভাবে গরম করতে হবে যাতে পুরোটা সমানভাবে গরম হয়।
বারবার গরম করবেন না: একই খাবার বারবার ঠান্ডা ও গরম করলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের দিনের খাবার খাওয়া নিয়ে অযথা আতঙ্কের প্রয়োজন নেই। সঠিক সংরক্ষণ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে অধিকাংশ খাবারই নিরাপদভাবে পুনরায় গরম করে খাওয়া সম্ভব।





