কারাগার থেকে মুক্ত সন্ত্রাসীদের তৎপরতায় উদ্বেগ, আতঙ্কে খুলনাবাসী

খুলনা জেলা প্রতিনিধিঃ ফাহিম ইসলাম
সাম্প্রতিক সময়ে কারাগার থেকে জামিন বা মুক্তি পাওয়া খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীগুলোর একাধিক সক্রিয় সদস্য পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় নগরজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এসব সন্ত্রাসী সদস্যের বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজি, হামলা, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেকেই মুক্তি পাওয়ার পর পুনরায় এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ধারাবাহিক অভিযানে খুলনার কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং তাদের বাহিনীর সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে তাদের অনেক সহযোগী বর্তমানে জামিনে বা মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কারাগার থেকে বের হয়ে তারা বিভিন্ন মামলার বাদী ও সাক্ষীদের মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছে। এসব হুমকির কারণে অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে খুলনার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন নুর আজিমসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। নুর আজিম কারাগারে থাকলেও তার বাহিনীর অন্যান্য সদস্য বাইরে থেকে তার নির্দেশে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খুন ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ২৯ মার্চ সোনাডাঙ্গা থানার বানরগাতি এলাকায় অভিযান চালিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশ শেখসহ ১১ জনকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে পলাশ শেখ ও কালা লাভলু কারাগারে থাকলেও বাহিনীর অন্যান্য সদস্য জামিনে মুক্ত রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তারা দলনেতার অনুপস্থিতিতে নগরীতে ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের চেষ্টা করছে।
গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, গত বছরের ৬ মে রাতে বটিয়াঘাটার চক্রাখালী এলাকায় অভিযান চালিয়ে কালা তুহিনসহ তিনজনকে অস্ত্র, গুলি ও মাদকসহ গ্রেপ্তার করে যৌথ বাহিনী। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি কালা তুহিন ও জিতু নামে দুই সদস্য কাশেমপুর উচ্চ নিরাপত্তা কারাগার থেকে মুক্তি পায়। অভিযোগ রয়েছে, যৌথ বাহিনীকে সহযোগিতা করার কারণে চলতি বছরের ৮ মে আজিজুল নামে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরে একই বাহিনীর হামলায় নিহত হন কাজী রাশেদ।
এদিকে গত ২২ ডিসেম্বর মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা মোতালেব শিকদার। এ ঘটনায় শুটার শামীম ওরফে ঢাকাইয়া শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে চলতি বছরের ১৩ মে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে পুনরায় সোনাডাঙ্গা এলাকার একটি বস্তিতে গোলাগুলির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
এ ছাড়া ঝিনাইদহের আলোচিত সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম হত্যা মামলার আসামি ও খুলনার এক সময়ের চরমপন্থি নেতা শিমুল ভূঁইয়াও সম্প্রতি আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার সকালে শেখপাড়া নজরুল নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে একটি মার্কেটে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় পুরি বাবুর নেতৃত্বে একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ অংশ নেয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, সন্ত্রাসী পুরি বাবুকে কিছুদিন আগে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। কারাগার থেকে বের হওয়ার বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার। অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
খুলনা মহানগর পুলিশের কমিশনার জাহিদুল হাসান বলেন, পুলিশের দায়িত্ব হলো অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা। জামিন বা মুক্তির বিষয়টি আদালত ও কারা কর্তৃপক্ষের আওতাধীন। তিনি বলেন, অনেক সময় অপরাধীরা শহরের বাইরে অবস্থান করে অপরাধ সংঘটিত করে দ্রুত সরে যায়, ফলে তাদের শনাক্ত ও আটক করা কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নগরবাসীর দাবি, মুক্তি পাওয়া সন্ত্রাসীদের ওপর কঠোর নজরদারি এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে খুলনায় শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।





