অভিযানে গিয়ে বারবার হামলার মুখে পুলিশ, বাড়ছে উদ্বেগ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে ধীরে ধীরে গতি ফিরতে শুরু করলেও অভিযান পরিচালনার সময় ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজিবিরোধী বিশেষ অভিযান চলমান থাকলেও পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা থামছে না। চলতি মাসে ঢাকাসহ দেশের অন্তত ৯ জেলায় ১৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন পুলিশ ও র্যাবের অন্তত ৩২ সদস্য।
এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম চার মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর আরও ২১৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। পৃথক ঘটনায় সিলেট ও চট্টগ্রামে একজন পুলিশ সদস্য এবং একজন র্যাব সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৮ মাসে সারা দেশে পুলিশের ওপর মোট ৮৩৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন স্থানে পুলিশের ওপর হামলা, জনরোষ এবং ‘মব’ পরিস্থিতির প্রভাব বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে মামলা, সংযুক্তি, প্রত্যাহার কিংবা চাকরি হারানোর আশঙ্কাও তাদের মধ্যে কাজ করছে। ফলে পুলিশের কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় লাগছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে অপরাধী চক্রের মধ্যে এক ধরনের ধারণা তৈরি হয়েছে যে, পুলিশ তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে রয়েছে এবং তাদের ওপর হামলা করলেও বড় ধরনের প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়তে হবে না। পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র ও সংঘবদ্ধ শক্তির ওপর ভর করে অপরাধীরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।
অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কিছু মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে কিছু পুলিশ সদস্যের মধ্যেও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি কাজ করছে।
তিনি বলেন, “আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও অনেক সময় দ্বিধা তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও জবাবদিহির আশঙ্কাও কাজ করছে। ফলে কিছু অপরাধী মনে করছে, অপরাধ করলেও কঠোর ব্যবস্থার মুখে পড়তে হবে না।”
তার ভাষ্য, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া কিছু অভিযানে যাওয়ার কারণে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব ঘটনার পর বাহিনীর সদস্যদের মনোবল শক্ত রাখার বিষয়ে বার্তা দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সিলেট ও চট্টগ্রামে প্রাণহানির ঘটনা
শুক্রবার সিলেট নগরে মাদকবিরোধী অভিযানে এক মাদক কারবারিকে আটক করতে গিয়ে র্যাব-৯-এর সদস্য ইমন আচার্য ছুরিকাঘাতে নিহত হন। পুলিশের ধাওয়া এড়িয়ে পালানোর সময় ওই ব্যক্তিকে আটক করতে গেলে তার বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়।
অন্যদিকে চট্টগ্রামে একটি অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জব্দের পর হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য আবদুল কুদ্দুস। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বুধবার তার মৃত্যু হয়।
রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় হামলার ঘটনা
চলতি মাসে রাজধানীতেও তিন দফায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত বুধবার পল্লবীর কালশী এলাকায় সরকারি জমি থেকে অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশ সদস্যরা হামলার শিকার হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে কয়েকজন সদস্য আহত হন।
এর আগে মোহাম্মদপুরে ছিনতাইকারীদের ধরতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। একই এলাকায় চেকপোস্টে অভিযান পরিচালনার সময় মাদক কারবারিদের সহযোগীদের হামলার ঘটনাও ঘটে।
নারায়ণগঞ্জে চলতি মাসে চারটি পৃথক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পুলিশের অস্ত্র ছিনতাই, আসামি ছিনিয়ে নেওয়া এবং র্যাব সদস্যদের ওপর হামলার মতো ঘটনাও রয়েছে। এসব ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এ ছাড়া বরিশাল, কুমিল্লা, নওগাঁ, কিশোরগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও নাটোরেও অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
আধুনিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের ডিন ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশকে বিশেষ ও আধুনিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সমন্বয় বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।”
পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, অপরাধ দমন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালনকালে কিছু ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী হামলার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সদস্যদের নিরাপত্তা ও পেশাগত সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”





