স্যাঁতসেঁতে বর্ষায় যেভাবে সতেজ রাখবেন ঘরের অন্দর

বর্ষা মৌসুমে বাইরে প্রকৃতি সজল ও সজীব হয়ে উঠলেও বাড়ির অন্দরমহল প্রায়শই হয়ে ওঠে স্যাঁতসেঁতে। আলমারি, কাপড়চোপড় ও ঘরের কোণ থেকে এক ধরনের সোঁদা গন্ধও পাওয়া যায়। তবে সামান্য কিছু নিয়ম ও বাড়তি যত্ন নিলেই এই বর্ষায়ও ঘরের অন্দর রাখা যায় একদম সতেজ ও প্রাণবন্ত।
এই বিষয়ে সৃষ্টি আর্কিটেকচার অ্যান্ড কনসালট্যান্সির প্রতিষ্ঠাতা স্থপতি তাসনিম তূর্যি এবং ঢাকার গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লায়েড হিউম্যান সায়েন্সের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্টারপ্রেনিউরশিপ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফারহানা শরীফ-এর পরামর্শ নিয়ে তৈরি করা হলো এই বিশেষ প্রতিবেদন।
আর্দ্রতার আক্রমণ ও ক্ষতি
বর্ষায় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অর্থাৎ আর্দ্রতা অনেক বেড়ে যায়। ঘরের ভেতর এই জলীয় বাষ্প জমলেই পরিবেশ অতিরিক্ত আর্দ্র হয়ে ওঠে। এর ফলে—
সহজেই দেয়াল ও আসবাবে ছত্রাকের (ফাঙ্গাস) আক্রমণ হয়।
পোকামাকড়ের উপদ্রব বৃদ্ধি পায় এবং দেয়ালে নোনা ধরে।
কাঠের আসবাবের স্বাভাবিক আকৃতি নষ্ট হতে পারে।
কাপড়ে তিলা বা দাগ পড়ে ও দুর্গন্ধ ছড়ায়।
চাই পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস
ঘরের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপায় হলো ঘরে আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ দেওয়া।
জানালা খোলা রাখা: বৃষ্টি যখন থাকবে না, তখন ঘরের জানালা-দরজা খুলে দিন। বিশেষ করে ক্রস ভেন্টিলেশন (একদিকের বাতাস অন্যদিক দিয়ে বের হওয়া) থাকলে ঘরের গুমোট ভাব দ্রুত কেটে যায়।
পাতলা পর্দা: বর্ষার দিনগুলোতে ভারী পর্দা সরিয়ে হালকা বা পাতলা পর্দা ব্যবহার করুন, যেন সহজেই আলো-বাতাস ঘরে ঢুকতে পারে এবং পর্দা ভিজে গেলেও দ্রুত শুকিয়ে যায়।
এগজস্ট ফ্যান ও চিমনি: রান্নাঘর ও ওয়াশরুমে নিয়মিত এগজস্ট ফ্যান ব্যবহার করুন। সম্ভব হলে কিচেন চিমনি সঠিক নিয়মে চালু রাখুন, যাতে রান্নার বাষ্প ঘরকে স্যাঁতসেঁতে করতে না পারে।
দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে ভাব দূর করা
ছাদ বা দেয়াল ভিজে উঠলে কিংবা প্লাস্টার খসে পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
পেশাদার লোকের সাহায্যে দেয়ালের প্লাস্টার ভেঙে নতুন করে প্লাস্টার করিয়ে এবং ড্যাম্প প্রুফ বা অ্যান্টিফাঙ্গাল পেইন্ট ব্যবহার করতে হবে।
ছাদে পানি জমলে তা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করুন এবং ভবনের পানির পাইপে কোনো লিক আছে কি না তা পরীক্ষা করান।
সতর্কতা: ঘরের বৈদ্যুতিক বোর্ড বা সুইচের আশপাশের দেয়াল ভিজে যাচ্ছে কি না সেদিকে কড়া নজর রাখুন। যেকোনো দুর্ঘটনা এড়াতে শিশু ও বয়স্কদের ঘরের দেয়াল রোজ একবার পরীক্ষা করা উচিত।
কাঠের দরজা ও আসবাবের যত্ন
বাতাসের আর্দ্রতায় কাঠ ফুলে ফেঁপে ওঠে। এতে দরজা খুলতে ও লাগাতে সমস্যা হয় এবং আসবাব বেঁকে যায়।
দরজা ও আসবাব: দরজার কবজা শক্ত হয়ে গেলে তেল ব্যবহার করুন। কাঠের দরজা বা আসবাবের আকার বদলে গেলে পেশাদার পলিশিং, ফিলার বা পানিরোধী রঙের প্রলেপ দিন।
আসবাব দেয়াল থেকে দূরে রাখুন: দেয়াল থেকে আসবাব অন্তত দুই-আড়াই ইঞ্চি দূরে রাখুন। আসবাব প্রতিদিন শুকনা কাপড় দিয়ে মুছুন এবং সপ্তাহে অন্তত একবার ড্রয়ার ও আলমারির দরজা খুলে হাওয়া লাগতে দিন।
প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ: আসবাব বা আলমারির ভেতর শুকনা নিমপাতা, সিলিকা জেলের প্যাকেট কিংবা কর্পূর রাখুন। তবে রাসায়নিক স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে ন্যাফথালিন ব্যবহার না করাই ভালো। কাপড় রাখার আগে কাঠের তাকে সাধারণ কাগজের বদলে ট্রেসিং পেপার বিছিয়ে নেওয়া উত্তম।
সতেজ অন্দর গড়তে আরও কিছু টিপস
পানি নিরোধক অনুষঙ্গ: ঘরের দরজা ও জানালায় ফোমজাতীয় অনুষঙ্গ ব্যবহার করুন যাতে বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢুকতে না পারে।
দ্রুত ঘর শুকানো: ঘর মোছার পর ফ্যান ছেড়ে মেঝে দ্রুত শুকিয়ে নিন। বালিশ ও কুশনজাতীয় জিনিস সুযোগ বুঝে রোদে দিন।
সুগন্ধি মোম ও ফুল: ঘরের গুমোট ভাব ও সোঁদা গন্ধ কাটাতে সুগন্ধি ফুল কিংবা প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি সুগন্ধি মোম ব্যবহার করতে পারেন।
ডিহিউমিডিফায়ার: সম্ভব হলে ঘরে একটি ডিহিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন। ঘরের ভেতরের আর্দ্রতা ৪০% থেকে ৬০% এর মধ্যে রাখতে পারলে ছত্রাকের উপদ্রব একদম কমে যায়।
গাছের যত্ন: ঘরের টবের গাছে অতিরিক্ত পানি দেবেন না। টবের নিচের প্লেটে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
চারপাশ পরিষ্কার রাখা: বারান্দা, ছাদ ও বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন। ময়লা ভিজে থাকলে বায়ুর আর্দ্রতা বাড়ে এবং এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হয়।





