কিশোরদের এআই চ্যাটবট আসক্তি নিয়ে বাড়ছে বৈশ্বিক উদ্বেগ

বিশ্বজুড়ে কিশোর-কিশোরীদের অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একের পর এক কঠোর আইন প্রণয়ন করছে বিভিন্ন দেশের সরকার। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন, কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপও নিয়েছে। তবে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সব নতুন আইনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উদীয়মান ঝুঁকি প্রায় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে—আর সেটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবট।
গত শুক্রবার (১০ জুলাই) প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে উন্নত বিশ্বের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক কিশোর-কিশোরী প্রতিনিয়ত চ্যাটজিপিটি, মাইক্রোসফট কোপাইলট এবং ক্যারেক্টার.এআই-এর মতো আধুনিক এআই চ্যাটবটগুলো ব্যবহার করছে। কেউ পড়াশোনার প্রয়োজনে, কেউ নতুন তথ্য জানতে, আবার কেউ কেবলই একাকীত্ব দূর করতে বা সময় কাটাতে এগুলো ব্যবহার করছে। তবে ভয়ের বিষয় হলো, ধীরে ধীরে বহু কিশোর এই ভার্চুয়াল চ্যাটবটগুলোর ওপর মানসিকভাবে মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
বাস্তব সম্পর্ক বনাম চ্যাটবটের কৃত্রিম দুনিয়া
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক কিশোর এখন বাস্তব জীবনের বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগের পরিবর্তে এআই চ্যাটবটের সঙ্গে একা একা ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। এর মূল কারণ হলো, চ্যাটবটগুলো সব সময় তাত্ক্ষণিক উত্তর দেয়, ব্যবহারকারীকে অন্ধভাবে সমর্থন করে এবং মানুষের মতো তার কোনো কথার বা আচরণের বিরোধিতা খুব কমই করে। ফলে সামাজিক নানা জটিলতা এড়াতে অনেকেই বাস্তব সম্পর্কের চেয়ে এআই-এর এই কৃত্রিম দুনিয়াকে বেশি স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ মনে করতে শুরু করেছে।
আমেরিকান গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক কিশোর কোনো না কোনো ফর্মে এআই চ্যাটবটের সঙ্গে নিয়মিত যুক্ত থাকে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অনেক কিশোরের আচরণের মধ্যে ইতিমধ্যে চ্যাটবট ব্যবহারের তীব্র আসক্তির লক্ষণ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার ভুলের পুনরাবৃত্তি?
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন–এর ডিজিটাল হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ক্যাটলিন রেগার এই বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, অতীতে সোশ্যাল মিডিয়ার শুরুর দিকে আমরা যে ধরনের উদাসীনতার ভুল করেছিলাম, এআই প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও যেন সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না হয়। তার মতে, পর্যাপ্তভাবে পরীক্ষিত ও নিরাপদ প্রমাণিত নয়—এমন অত্যন্ত শক্তিশালী এআই প্রযুক্তি সরাসরি শিশু-কিশোরদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে, অথচ এর সম্ভাব্য মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকি মোকাবেলায় রাষ্ট্রগুলোর কাছে এখনো কোনো পর্যাপ্ত নিয়ম-কানুন বা সেন্সরশিপ নেই।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক সোনিয়া লিভিংস্টোন এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিশ্বের ক্ষমতাধর সরকারগুলো এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগকে যতটা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন ও কঠোর নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে তাদের গতি ততটাই ধীর।
আইন প্রণয়নের বর্তমান পরিস্থিতি
সিএনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য কিছু বিশেষ ধরনের ক্ষতিকর এআই ‘রোমান্টিক কম্প্যানিয়ন’ বা ভার্চুয়াল সঙ্গী চ্যাটবটের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আনার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সাধারণ এবং বহুল ব্যবহৃত এআই চ্যাটবট নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে এখনো কোনো বিস্তৃত বৈশ্বিক নীতিমালা গড়ে ওঠেনি।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের সঙ্গে এআই চ্যাটবটের অনিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ ও তথ্য সংগ্রহ সীমিত করতে একটি বিশেষ বিল প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) পাস হয়েছে। তবে এটি এখনো দেশটির আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটের চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়ার মতো এআই চ্যাটবটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আসক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ব্যাধি তৈরি হতে পারে। তাই এখনই যদি বিশ্বব্যাপী কার্যকর আইন ও কঠোর নীতিমালা তৈরি না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে মানব সমাজের ওপর এর নেতিবাচক ও বিধ্বংসী প্রভাব আরও বহুগুণ বাড়তে পারে।





