রাত নামলেই আতঙ্ক: কুমিল্লা নগরীতে বাড়ছে ছিনতাই, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

কুমিল্লা নগরীতে দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। গভীর রাতে দূরপাল্লার বাস ও ট্রেন থেকে নামা যাত্রী থেকে শুরু করে ভোরে কাজে বের হওয়া শ্রমজীবী মানুষ—কেউই এখন পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করছেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত টহল ও অভিযান চালানোর কথা জানালেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন জুয়া ও মাদকসংশ্লিষ্ট অর্থের চাহিদা বাড়ায় ছিনতাইয়ের মতো অপরাধও বাড়ছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রাতের দৃশ্য এখন অনেকের কাছেই আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠছে। দূরপাল্লার বাস থেকে নেমে কেউ হাতে ব্যাগ নিয়ে বাড়ির পথে, কেউ ক্লান্ত শরীরে ফিরছেন দিনের শেষে। কিন্তু অন্ধকারে ওত পেতে থাকে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র। কে একা, কার কাছে মূল্যবান কিছু রয়েছে, কিংবা কে দুর্বল—এসব লক্ষ্য করেই তারা টার্গেট ঠিক করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রায় এক মাস আগে ধারণ করা একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, নগরীর একটি নির্জন সড়কে চলন্ত একটি অটোরিকশার গতিরোধ করে আরেকটি অটোরিকশা। কয়েকজন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র হাতে দ্রুত যাত্রীর কাছ থেকে টাকা, মোবাইল ফোন ও ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
গত ২৫ এপ্রিল সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকা থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নামতি হাইওয়ে পুলিশ। জানা যায়, প্রশিক্ষণ শেষে চট্টগ্রাম থেকে ফেরার পথে বাস থেকে নামার পর তিনি ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। পরদিন তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু গভীর রাত নয়, ভোরের সময়ও এখন নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিদিন ভোরে কাজের উদ্দেশ্যে বের হন শ্রমিক, চাকরিজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কিন্তু মানুষের উপস্থিতি কম থাকায় ফাঁকা সড়কগুলোকে কাজে লাগাচ্ছে অপরাধীরা।
ট্রেনে কুমিল্লায় আসা বিপ্লব নামে এক যাত্রী বলেন, রাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে গেছে। নিরাপদে বাসায় পৌঁছানো নিয়েও এখন উদ্বেগ কাজ করে। তার মতে, যখন বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও হামলার খবর পাওয়া যায়, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
মিশুকচালক বাবুল মিয়া বলেন, সম্প্রতি তার গাড়িতে থাকা এক যাত্রীর কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, রাতের শহরে এমন ঘটনা এখন প্রায়ই ঘটছে।
অপরাধ বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে কয়েকজন সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত যুবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইন জুয়া ও মাদকাসক্তি এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। তাদের দাবি, দ্রুত অর্থ আয়ের প্রলোভনে অনেক তরুণ অনলাইন জুয়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। পরে অর্থ হারিয়ে এবং মাদকের নেশায় জড়িয়ে তারা অপরাধের পথে যাচ্ছে।
সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় কুমিল্লায় বিভিন্ন ধরনের মাদক সহজলভ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবাসহ নানা মাদকের প্রতি তরুণদের একটি অংশের আসক্তি বাড়ছে। আর এসবের অর্থ জোগাতে তারা ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা সিসিটিভিতে ধরা পড়লেও অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইসতিয়াক হাসান আমিন জানান, গত তিন মাসে ৩০টি মামলায় ৫০ জনের বেশি ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টহল দল নিয়মিত কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
ইতিহাসবিদ আহসানুল কবির বলেন, পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয়, অনলাইন জুয়ার বিস্তার এবং মাদকের প্রভাব নতুন ধরনের অপরাধপ্রবণতা তৈরি করছে। তার মতে, অনেক অপরাধী গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তার নয়; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে অপরাধের মূল কারণগুলোও চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ রাতের অন্ধকার কাটলেও মানুষের মনে জমে থাকা আতঙ্ক এখনো কাটেনি।





