যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ১৪ দফা সমঝোতা, যুদ্ধবিরতি থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের রূপরেখা

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যে ১৪ দফা একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই এটি কার্যকর হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন-এ অংশ নেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অপরদিকে এতে স্বাক্ষর করেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
চুক্তিটি মূলত একটি সমঝোতা স্মারক, যেখানে যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
যুদ্ধ বন্ধ ও পারস্পরিক হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার
চুক্তির প্রথম দফায় যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্রদের ‘সব ফ্রন্টে’ সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এর আওতায় লেবাননসহ আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এছাড়া উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করবে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে বলে সম্মত হয়েছে।
৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্য
সমঝোতা অনুযায়ী, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনা চালানো হবে। প্রয়োজনে পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যাবে।
অবরোধ প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত
চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা প্রত্যাহার শুরু করবে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এসব ব্যবস্থা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বিনিময়ে ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করবে। নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে মাইন অপসারণ এবং অন্যান্য সামরিক বাধা দূর করা হবে।
৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা
চুক্তিতে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও এ তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অর্থায়ন করবে না, তবে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রদানে সহায়তা করবে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের রূপরেখা
চূড়ান্ত চুক্তির অগ্রগতির ভিত্তিতে ইরানের ওপর আরোপিত একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সংশ্লিষ্ট বিধিনিষেধ ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া তেল রপ্তানি ও ব্যাংকিং খাতে কিছু ছাড় দেওয়ার বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে শর্ত
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইরান কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। বর্তমানে দেশটির কাছে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা-এর তত্ত্বাবধানে ধ্বংস করা হবে অথবা এর সমৃদ্ধির মাত্রা কমিয়ে ফেলা হবে।
চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার পরমাণু কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে এবং এর বিনিময়ে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না যুক্তরাষ্ট্র।
জব্দ অর্থ ফেরত ও তদারকি ব্যবস্থা
চুক্তি অনুযায়ী, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই অর্থ ধাপে ধাপে ছাড় করা হবে এবং তা ইরানের চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে।
এ ছাড়া চুক্তি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ তদারকি ব্যবস্থা গঠন করা হবে। পরবর্তী সময়ে এই সমঝোতার ভিত্তিতে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা হবে এবং শেষ পর্যন্ত তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মাধ্যমে আইনি বাধ্যবাধকতা পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন চুক্তিটিকে ‘পারফরম্যান্সভিত্তিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। অর্থাৎ, ইরান চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন করলে ধাপে ধাপে এর সুবিধা পাবে। দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর এটিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।





