মক্কায় তারাবি শেষে বাসায় ফেরা হলো না প্রবাসী বাংলাদেশির

তারাবির নামায থেকে ফেরার পথে সৌদি আরবের মক্কায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এক প্রবাসী বাংলাদেশী। প্রাণত্যাগের আগে আহত অবস্থায় ঐ প্রবাসী শেষ ইচ্ছা হিসেবে জানান, তাকে যেন মক্কায় দাফন করা হয়। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার এই রেমিট্যান্স যোদ্ধা মফিজুর রহমানের এমন আকস্মিক প্রয়াণে তার পরিবার ও এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো এই মানুষটি শেষ পর্যন্ত চিরচেনা স্বদেশে আর ফিরতে পারলেন না।
পটিয়া পৌরসভার চার নম্বর ওয়ার্ডের মাঝের ঘাটা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন পঁয়ষট্টি বছর বয়সী মফিজুর রহমান। জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘ বারো বছর ধরে সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থান করছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তার কাঁধে ছিল বিশাল দায়িত্ব। গত দশই মার্চ মঙ্গলবার রাতে যখন পবিত্র রমজানের তারাবির নামাজ শেষ করে তিনি তার বাসস্থানে ফিরছিলেন, ঠিক তখনই এক ঘাতক গাড়ি তার জীবনের চাকা থামিয়ে দেয়।
জানা যায়, মক্কার একটি রাস্তায় রাস্তা পার হওয়ার সময় অত্যন্ত দ্রুতগামী একটি গাড়ি তাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি রাস্তায় ছিটকে পড়েন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত পান। উপস্থিত স্থানীয় লোকজন ও সহকর্মীরা তৎক্ষণাৎ তাকে উদ্ধার করে নিকটস্থ একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মঙ্গলবার দিবাগত রাত আনুমানিক একটার দিকে চিকিৎসকেরা জানান, তিনি আর বেঁচে নেই।
মফিজুর রহমানের এই চলে যাওয়া একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্নের সমাধি। প্রয়াতর বড় ছেলে তারেকুর রহমান জানিয়েছেন, তার বাবা যখন প্রয়াণের সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন, তখন তিনি তার নিয়োগকর্তা বা কফিলের কাছে একটি বিশেষ আর্জি জানিয়েছিলেন। যন্ত্রণায় কাতর মফিজুর রহমান অনুরোধ করেছিলেন, যদি তিনি প্রাণত্যাগ করেন, তবে যেন তাকে মক্কার পবিত্র মাটিতেই সমাহিত করা হয়। বাবার এই শেষ ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে পরিবার এখন তাকে সৌদি আরবেই দাফন করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। যদিও প্রিয় মানুষটির মুখ শেষবারের মতো দেখতে না পাওয়ার বেদনা স্বজনদের বিদীর্ণ করছে, তবুও তার অন্তিম ইচ্ছা পূরণকেই তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মফিজুর রহমান ছিলেন পরিবারের মূল স্তম্ভ। তার অবর্তমানে তার স্ত্রী, দুই ছেলে এবং চার মেয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়েছেন। নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যাওয়া এই মানুষটি শেষবার দেশে এসেছিলেন দুই হাজার উনিশ সালে। দীর্ঘ বারো বছর ধরে তিনি বিদেশের মাটিতে পরিশ্রম করেছেন শুধুমাত্র সন্তানদের ভালো রাখার আশায়। দীর্ঘ এই প্রবাস জীবনে তিনি যখন যে কাজ পেয়েছেন, তা দিয়েই অতি কষ্টে সংসার চালিয়েছেন। পটিয়ার মাঝের ঘাটা এলাকায় তার প্রাণত্যাগের খবর পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনরা শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন।
মফিজুর রহমানের নিয়োগকর্তা ইতোমধ্যে তার প্রয়াণের বিষয়টি দাফন সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতার জন্য নিশ্চিত করেছেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদেশের মাটিতে থাকা এই প্রবাসী শ্রমিকের জীবনাবসান বাংলাদেশের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ত্যাগের এক করুণ উপাখ্যান হয়ে থাকলো। শোকাতুর পরিবারের সদস্যরা এখন তার আত্মার মাগফিরাত কামনায় দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। প্রবাসের কর্মব্যস্ত জীবনে যে মানুষটি দিনরাত এক করে খেটেছেন, শেষ পর্যন্ত তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মক্কার পবিত্র মাটিই হলো তার চিরস্থায়ী ঠিকানা।
পটিয়ার সেই সহজ-সরল মানুষটি আর কোনোদিন দেশে ফিরবেন না, তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার প্রহর এভাবেই বিয়োগান্তক এক দুর্ঘটনায় শেষ হয়ে গেল। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিলো, প্রবাসীদের জীবন কতটা অনিশ্চিত এবং তাদের আত্মত্যাগ কতটা বিশাল। মফিজুর রহমানের চলে যাওয়ায় পটিয়া এলাকায় যে শোকের ছায়া নেমেছে, তা সহজে মুছবার নয়। পরিবারের সদস্যরা এখন কেবল পবিত্র ভূমিতে তার দাফন সম্পন্ন হওয়ার খবরের অপেক্ষায়।






