নতুন পে স্কেল ঘিরে বাড়ছে বৈষম্যের শঙ্কা, চাপে পড়তে পারে বেসরকারি খাত

প্রায় এক দশক পর দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো কার্যকরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এতে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও বেসরকারি খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মীর বেতন কাঠামোয় আপাতত কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এর ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের মধ্যে ক্রয়ক্ষমতার পার্থক্য আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ের প্রভাবে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
জানা গেছে, নতুন পে স্কেল এক ধাপে নয়, তিন অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম দুই বছরে মূল বেতন ৫০ শতাংশ করে সমন্বয় করা হবে। তৃতীয় বছরে যুক্ত হবে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা।
এ লক্ষ্যে আসন্ন জাতীয় বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটি এ বিষয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ করবে বলে জানা গেছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেসরকারি চাকরিতে তুলনামূলক বেশি বেতন ও দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে অনেক তরুণ এই খাতের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তবে নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
চাকরিবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী এবং ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ সময় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন কোনো পে স্কেল হয়নি। এই সময়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক।
তবে তাঁর মতে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারের প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি বলেন, “এই বিপুল অর্থ বাজারে এলে মূল্যস্ফীতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।”
ফাহিম মাশরুরের মতে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে অর্থনৈতিক মন্দা ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কর্মীদের প্রত্যাশিত বেতন-সুবিধা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে বাজারে আবার মূল্যস্ফীতি বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বেসরকারি খাতের ওপর বাড়তে পারে চাপ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ সরকারি খাতে। অন্যদিকে ৯৩ শতাংশের বেশি মানুষ কাজ করছেন বেসরকারি, করপোরেট এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে।
গত চার বছর ধরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি রয়েছে। একই সময়ে সরকারি কর্মীরা নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি ও বিভিন্ন ভাতা পেলেও বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানে বেতন বৃদ্ধি সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
নতুন পে স্কেলে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা প্রায় ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যম পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা উচ্চ হারে কর দিই। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখি সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি। এর সঙ্গে চাকরির নিরাপত্তা ও পেনশন সুবিধাও রয়েছে।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বৈষম্য মেধাবী তরুণদের সরকারি চাকরির দিকে আরও বেশি আকৃষ্ট করতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাত দক্ষ জনবল ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতির মনস্তাত্ত্বিক চাপের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে সরকারি বেতন বৃদ্ধির ঘোষণার পর বাজারে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির নজির রয়েছে। ২০১৫ সালের অষ্টম পে স্কেলের পর বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি ছিল। অন্যদিকে একই সময়ে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হলেও এর ফলে বেসরকারি খাতের কর্মীরা অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপে পড়তে পারেন।
তিনি বলেন, “দেশের অধিকাংশ কর্মসংস্থান যেখানে বেসরকারি খাতে, সেখানে দুই খাতের ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধান সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।”
তাঁর মতে, বাজারে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কঠোর তদারকি জরুরি। পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করতে কর সুবিধা, উৎপাদনশীল খাতে নীতিগত সহায়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইনও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন করে পণ্যের দাম বাড়ানোর অজুহাত তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, “সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ার সুবিধা সীমিতসংখ্যক মানুষ পেলেও এর প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়তে পারে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি বাজার তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই উদ্যোগ যেন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি না করে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।





