চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি নিয়ে নতুন বিতর্ক, জড়িত এমপিদের প্রতিষ্ঠান

জোবায়ের হোসেন, চট্টগ্রাম :
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি। বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির সবচেয়ে বড় অংশ পরিচালিত হয় এই টার্মিনাল দিয়ে। আর সেই এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব আগামী ১৫ বছরের জন্য দুবাইভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়া যখন এগিয়ে চলছে, তখনই সামনে এসেছে নতুন এক বিতর্ক।
বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মধ্যে সরকার-সরকার বা জিটুজি চুক্তির আওতায় এনসিটি পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে। চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড নিজস্ব অর্থায়নে আধুনিক ক্রেন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি স্থাপন করবে এবং ১৫ বছর পরিচালনার পর সেগুলো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করবে। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকেও বন্দর কর্তৃপক্ষকে এই চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে এই জিটুজি আলোচনা চলমান থাকার মধ্যেই গত ২৮ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে একটি গোপন প্রস্তাব জমা দেয় ‘সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস কনসোর্টিয়াম’। প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন সাইফ পাওয়ারটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মোহাম্মদ রুহুল আমিন, এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন এবং কসমস এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজিং পার্টনার ব্যারিস্টার হাসান বিন আশরাফ।
কনসোর্টিয়ামটির প্রস্তাব অনুযায়ী, তারা প্রতি কনটেইনার ওঠানামার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ৬৯ ডলার মাশুল চেয়েছে। কিন্তু বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক জিটুজি আলোচনা চলাকালে কোনো দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এভাবে সমান্তরাল প্রস্তাব জমা দিতে পারে কি না, সেটি বড় একটি প্রশ্ন।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির দুই সংসদ সদস্যের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য। অন্যদিকে কসমস এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান। আর কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাবে স্বাক্ষরকারী ব্যারিস্টার হাসান বিন আশরাফ হলেন হুইপ নিজানের ছেলে।
এ ঘটনাকে ঘিরে সামনে এসেছে আরপিও বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বিষয়টিও। সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, আরপিওর ১২(৪) ধারায় উল্লেখ রয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি সরকারের সঙ্গে ব্যবসা, সরবরাহ বা চুক্তিতে সরাসরি যুক্ত থেকে লাভবান হন, তাহলে তার নির্বাচনী যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে যৌথ মূলধনী কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে, যদি তিনি কোম্পানির পরিচালক বা প্রধান না হন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস ও টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেছেন, তিনি শুনেছেন হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজানের মালিকানাধীন কসমস এন্টারপ্রাইজ এবং সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেনের মালিকানাধীন এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসকে নিয়ে সাইফ পাওয়ারটেক একটি প্রস্তাব দিয়েছে। তবে আরপিওতে এ বিষয়ে কী বলা আছে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তার মতে, দেশের স্বার্থ বিবেচনা করেই সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালকে ঘিরে তাই এখন একের পর এক প্রশ্ন উঠছে। জিটুজি প্রক্রিয়া চলমান অবস্থায় কেন জমা পড়ল এই বিকল্প প্রস্তাব? সংসদ সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা কি আইনগত ও নৈতিক বিতর্ক তৈরি করছে? আর শেষ পর্যন্ত এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে যাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছে বন্দর সংশ্লিষ্ট মহল।






