কর্ণফুলীর তীরে সবুজ শিল্পাঞ্চল কেইপিজেড, রপ্তানি আয় ৩০ হাজার কোটি টাকা

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে গড়ে ওঠা কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) দেশের অন্যতম বৃহৎ পরিবেশবান্ধব বেসরকারি শিল্পাঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কোরিয়ার উদ্যোক্তা কিহাক সাংয়ের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই শিল্পাঞ্চল গত এক দশকের বেশি সময়ে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় করেছে। একই সঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দিয়েছে।
১৯৯৯ সালে প্রায় আড়াই হাজার একর জমির ওপর কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে ২ হাজার ৪৯২ একর আয়তনের এ শিল্পাঞ্চলে ৪৮টি শিল্পকারখানা চালু রয়েছে। জুতা, পোশাক, টেক্সটাইল, ব্যাগ, সুতা ও বিভিন্ন রপ্তানিমুখী পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে প্রতিষ্ঠানটি।
কেইপিজেড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০১২ সালে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর গত ১৩ বছরে এখান থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। বর্তমানে ইয়ংওয়ান গ্রুপ ও কেইপিজেড দেশের শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সবুজ শিল্পায়নের মডেল
শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে কেইপিজেড। শিল্পাঞ্চলটিতে এ পর্যন্ত ২০ লাখের বেশি গাছ রোপণ করা হয়েছে। মোট এলাকার প্রায় ৫২ শতাংশ সবুজায়নের আওতায় রাখা হয়েছে। এছাড়া ১৭টি জলাধার তৈরি করা হয়েছে, যা বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পুরো শিল্পাঞ্চলের মাত্র ২০ শতাংশ এলাকা শিল্প কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি ৮০ শতাংশ এলাকা সংরক্ষিত রয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য।
শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আধুনিক তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুনঃব্যবহার এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহারও নিশ্চিত করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, টেকসই শিল্পায়নের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাও জরুরি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কেইপিজেড দেশের সবুজ শিল্পায়নের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বোটানিক্যাল গার্ডেনে ১,৩০০ প্রজাতির উদ্ভিদ
কেইপিজেডে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বোটানিক্যাল গার্ডেনে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রজাতির বৃক্ষ, গুল্ম, লতা, বিরুৎ, জলজ ও ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ১৬টি পৃথক সেকশনে এসব উদ্ভিদের চারা রোপণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গার্ডেনটি পরিদর্শন করে এর জীববৈচিত্র্যের প্রশংসা করেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৬-২০২৭ সালের মধ্যে উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা দুই হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে চলতি বছর দুই লাখ দেশীয় গাছ রোপণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচিতে জাম, গামার, গর্জন, চাপালিশ, চিকরাশি, লোহাকাঠ, সেগুন ও চম্পাসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো হবে।
রপ্তানি ও জিডিপিতে অবদান
কেইপিজেড সূত্র জানায়, ইয়ংওয়ান গ্রুপের কারখানাগুলো থেকে বছরে প্রায় ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের পণ্য রপ্তানি হয়। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কেইপিজেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মুশফিকুর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ এলে এ অর্জন আরও বাড়বে।
বর্তমানে ইয়ংওয়ানের নিজস্ব ৪৮টি শিল্পকারখানার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানও কেইপিজেডে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বিনিয়োগ প্রায় ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সম্মানসূচক নাগরিকত্ব পেয়েছেন কিহাক সাং
প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশের শিল্প খাতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন কিহাক সাং। আশির দশকে তৈরি পোশাক শিল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে তার যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি ইয়ংওয়ান বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন এবং কেইপিজেড গড়ে তোলেন।
বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি তাকে সম্মানসূচক বাংলাদেশি নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তার হাতে এ সম্মাননা তুলে দেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ
বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা কেইপিজেড পরিদর্শন করেন। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য ও ভারতসহ প্রায় ৪০টি দেশের ৬০ জনের বেশি বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি শিল্পাঞ্চলটির বিভিন্ন স্থাপনা ঘুরে দেখেন।
পরিদর্শন শেষে অনেক বিনিয়োগকারী ভবিষ্যতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন। নেদারল্যান্ডসের এক বিনিয়োগকারী প্রতিনিধি বলেন, কেইপিজেডের পরিবেশ ও অবকাঠামো শিল্প বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।
তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতাকে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন কিহাক সাং। তার মতে, এসব সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়বে।
সৌরবিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উদ্যোগ
কেইপিজেডে ৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। বর্তমানে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ১৬ মেগাওয়াট শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অবশিষ্ট অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
শিল্পাঞ্চলটির আওতায় একটি হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ ইতোমধ্যে চালু হয়েছে। এছাড়া টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি চলছে। আন্তর্জাতিক মানের আরেকটি হাসপাতাল নির্মাণকাজও শুরু হয়েছে।
৭০ হাজার কর্মসংস্থানের লক্ষ্য
বর্তমানে কেইপিজেডে ৩৫ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ নারী। কর্তৃপক্ষের আশা, চলমান শিল্পপ্রকল্পগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে কর্মসংস্থানের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার পর আনোয়ারা ও কর্ণফুলী অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, আবাসন, পরিবহন ও সেবাখাতেও ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।
কেইপিজেড করপোরেশন (বিডি) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পায়নের কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে কেইপিজেড একটি আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। নতুন বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়নের গতি আরও বাড়বে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।






