এআইয়ের সহায়তায় মিলছে ‘লুকিয়ে থাকা’ শুক্রাণু, বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় উন্মোচিত নতুন সম্ভাবনা

বহু বছর ধরে সন্তানের অপেক্ষায় থাকা দম্পতিদের জন্য নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রযুক্তি। চিকিৎসকদের মতে, যেসব পুরুষকে আগে বলা হয়েছিল তাদের শরীরে কার্যকর কোনো শুক্রাণু নেই, তাদের মধ্যেও এখন বিরল শুক্রাণু শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
দুই বছর ছয় মাসের দীর্ঘ ও মানসিকভাবে কঠিন পথ পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বাসিন্দা পেনেলোপ অবশেষে সুখবরটি পেয়েছিলেন। কাজ শেষে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে চিকিৎসকের ফোনে জানতে পারেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন।
এর আগে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পেনেলোপ ও তার স্বামী স্যামুয়েল জানতে পারেন, স্যামুয়েল ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোমে আক্রান্ত। এটি একটি জিনগত অবস্থা, যেখানে একজন পুরুষ অতিরিক্ত একটি এক্স ক্রোমোজোম নিয়ে জন্মান। অনেক সময় এই সমস্যা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত ধরা পড়ে না।
এই অবস্থায় আক্রান্ত অধিকাংশ পুরুষের বীর্যে শুক্রাণুর পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকে বা একেবারেই অনুপস্থিত বলে মনে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে বলা হয় অ্যাজোস্পার্মিয়া। বন্ধ্যত্বে ভোগা পুরুষদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই সমস্যায় আক্রান্ত।
পেনেলোপ বলেন, সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন তিনি, যেন স্যামুয়েল বাড়ি ফেরার পর নিজের মুখে খবরটি জানাতে পারেন।
তার ভাষায়, “ওর মুখে একের পর এক অনুভূতির পরিবর্তন দেখছিলাম। ও কেঁদে ফেলেছিল। এত সময়, চেষ্টা আর সংগ্রামের পর আমরা শেষ পর্যন্ত সেই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি। আমাদের হাতে মাত্র একটি ভ্রূণ ছিল, আর সেটিই সফল হয়েছে।”
তাদের এই সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে নতুন প্রযুক্তি স্টার, যার পূর্ণরূপ স্পার্ম ট্র্যাক অ্যান্ড রিকভারি সিস্টেম।
এই প্রযুক্তি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এর লক্ষ্য হলো অ্যাজোস্পার্মিয়ায় আক্রান্ত পুরুষদের নমুনার ভেতরে থাকা অত্যন্ত বিরল শুক্রাণু শনাক্ত করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে এমন শুক্রাণুর অবস্থান নির্ধারণ করা হয়, যা সাধারণ পরীক্ষায় খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
স্যামুয়েল বলেন, “আমার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, হয়তো কোনো দিন নিজের জৈবিক সন্তান হবে না। এটা আমার জীবনের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।”
চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছিলেন, তার নিজের সন্তানের বাবা হওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ২০ শতাংশ।
বিশ্বজুড়ে বন্ধ্যত্ব এখন বড় স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, সন্তান ধারণের সক্ষম বয়সে প্রতি ছয়জন মানুষের একজন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সন্তান নিতে সমস্যায় পড়েন।
এসব ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক পরিস্থিতিতে পুরুষও সহায়ক কারণ হিসেবে যুক্ত থাকেন। আর বিশ্বব্যাপী মোট পুরুষদের প্রায় এক শতাংশ অ্যাজোস্পার্মিয়ায় ভোগেন।
এর অর্থ হলো, লাখো পুরুষের শরীরে এমন অতি অল্প পরিমাণ শুক্রাণু থাকতে পারে, যা সাধারণ পরীক্ষায় ধরা পড়ে না। ফলে তাদের অনেককেই ভুলভাবে সম্পূর্ণ শুক্রাণুশূন্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
প্রায় পাঁচ বছরের গবেষণা ও উন্নয়ন শেষে গত বছরের শেষ দিকে স্টার প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রথম শিশু জন্ম নেয়। ওই দম্পতি প্রায় দুই দশক ধরে সন্তানহীনতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ফার্টিলিটি সেন্টারের পরিচালক জেভ উইলিয়ামস বলেন, “সেই মুহূর্তটা এখনো আমাদের কাছে স্মরণীয়। বহু বছরের পরিশ্রমের এমন সুন্দর ফল পাওয়া খুব বিরল।”
তিনি জানান, প্রথম শিশুর জন্মের পর থেকে প্রযুক্তিটি নিয়মিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শতাধিক মানুষ অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন।
সাম্প্রতিক ১৭৫ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা দেখেছেন, প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে এমন শুক্রাণু শনাক্ত করা গেছে, যাদের আগে বলা হয়েছিল নিজের শুক্রাণু দিয়ে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এছাড়া প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদের হাতে করা প্রচলিত অনুসন্ধানের তুলনায় স্টার প্রায় ৪০ গুণ বেশি শুক্রাণু শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
সাধারণত এক মিলিলিটার বীর্যে কয়েক কোটি শুক্রাণু থাকে। কিন্তু অ্যাজোস্পার্মিয়ার ক্ষেত্রে পুরো নমুনায় একটি মাত্র শুক্রাণু থাকতে পারে, আবার কোনো ক্ষেত্রে একটিও নাও থাকতে পারে।
উইলিয়ামস জানান, নতুন তারা খুঁজতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের একটি প্রতিবেদন পড়েই তার মাথায় স্টার প্রযুক্তির ধারণা আসে।
আধুনিক দূরবীক্ষণ যন্ত্র মহাকাশ থেকে বিপুল তথ্য সংগ্রহ করে। মানুষের পক্ষে এসব বিশ্লেষণ করা সময়সাপেক্ষ হলেও মেশিন লার্নিং অল্প সময়েই তা করতে পারে।
উইলিয়ামস বলেন, “যেসব পুরুষকে বলা হয় তাদের কোনো শুক্রাণু নেই, তাদের নমুনার দৃশ্যও অনেকটা রাতের আকাশে বিরল তারকা খোঁজার মতো।”
এই প্রযুক্তিতে মাইক্রোফ্লুইড চিপ ব্যবহার করা হয়। কাঁচ বা বিশেষ পলিমারে তৈরি এই চিপে মানুষের চুলের মতো সরু চ্যানেল থাকে। নমুনা এসব চ্যানেল দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইমেজিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্ক্যান করা হয়।
এরপর মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম প্রতি সেকেন্ডে শত শত ছবি বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য শুক্রাণু শনাক্ত করে।
উইলিয়ামস বলেন, “আমরা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩০০টি ছবি ধারণ করি। বেশিরভাগই থাকে খণ্ডাংশ বা অপ্রয়োজনীয় উপাদান। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই বিরল শুক্রাণু খুঁজে বের করতে হয়।”
তার দাবি, স্টার প্রযুক্তি শতভাগ সংবেদনশীলতা অর্জন করেছে। অর্থাৎ একটি নমুনায় যদি মাত্র একটি শুক্রাণুও থাকে, তাহলে সেটিও শনাক্ত করা সম্ভব।
স্যামুয়েলের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল ছিল। ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোমে আক্রান্তদের বীর্যে সাধারণত শুক্রাণু থাকে না। তাই তাকে নয় মাস হরমোন চিকিৎসা নিতে হয় এবং অণ্ডকোষ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহের অস্ত্রোপচার করাতে হয়।
পরে সেই নমুনা কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের কাছে পাঠানো হয়।
স্টার প্রযুক্তি সেখান থেকে আটটি শুক্রাণু আলাদা করতে সক্ষম হয়। সেগুলো পেনেলোপের ডিম্বাণুতে প্রয়োগ করা হয়। এর মধ্যে একটি সফলভাবে পূর্ণ ব্লাস্টোসিস্টে পরিণত হয়।
জুলাইয়ের শেষ দিকে তাদের সন্তানের জন্ম হওয়ার কথা রয়েছে। দম্পতির ধারণা, এটি স্টার প্রযুক্তির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া প্রথম ছেলে শিশু হতে পারে।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু শুক্রাণু খোঁজার কাজেই সীমাবদ্ধ নয়। ডিম্বাণু উদ্দীপনা, ভ্রূণ নির্বাচন এবং চিকিৎসার ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিকল্পনাতেও এটি সহায়তা করছে।
তবে গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও বড় পরিসরের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা প্রয়োজন। পাশাপাশি চিকিৎসা তথ্যের গোপনীয়তা, দায়বদ্ধতা এবং মালিকানা সম্পর্কিত বিষয়গুলোও পরিষ্কার করা জরুরি।
যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতিবিদ্যার অধ্যাপক সিওভান কুইনবি বলেন, “উন্নত ইমেজিং, প্রকৌশল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় পুরুষ বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে একটি সফল ঘটনা দিয়ে পুরো কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।”
স্যামুয়েলের কাছে অবশ্য সবচেয়ে বড় বিষয় এখন একটি নতুন অনুভূতি—আশা।
তিনি বলেন, “এখন আমরা ভবিষ্যতে আরও একটি সন্তানের স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছি। কারণ আজ এমন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আগে কোনো আশাই ছিল না।”





