১০০ দিনেই বিক্ষোভের মুখে নেপালের বালেন শাহ সরকার

কাঠমান্ডু,১৮ জুলাই : নেপালে ক্ষমতায় আসার মাত্র ১০০ দিনের মাথায় ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়েছে প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহর নেতৃত্বাধীন সরকার। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা এই প্রশাসনের বিরুদ্ধেই এবার রাস্তায় নেমেছেন সেই তরুণেরা, যারা একসময় সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
রোববার কাঠমান্ডুর সিংহ দরবার সচিবালয়ের সামনে শত শত বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে ‘গরিবের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করো’ এবং ‘মানবাধিকারকে সম্মান করো’—এমন স্লোগান দেখা যায়। এসব স্লোগান সরাসরি বর্তমান সরকারের নীতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটে ৯ জুলাই কাঠমান্ডুর পাসপোর্ট অফিসের সামনে গণেশ নেপালি নামের ২৫ বছর বয়সী এক রাইড-শেয়ারিং চালকের আত্মক্ষতির চেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মোটরসাইকেল পার্কিং নিয়ে পৌর পুলিশের সঙ্গে বিরোধের জেরে তিনি নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি আর বাঁচেননি। যদিও ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে এবং জরিমানা বা চাকা লক করা সরাসরি কারণ ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।
ঘটনার পরবর্তী দুই দিনে আরও দুজন—অশ্বিন রাউত ও বিবেক মন্ডল—একই ধরনের আত্মক্ষতির চেষ্টা করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে।
এদিকে, গত এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে নদীতীরবর্তী অবৈধ বসতি উচ্ছেদে সরকারের অভিযানও জনঅসন্তোষের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি হিসাবে, এ পর্যন্ত ২,৬০০-এর বেশি পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হয়েছে, ফলে অনেক মানুষ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের অবৈধ দখলদারি ও বন্যাপ্রবণ এলাকা উদ্ধার করতেই এই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তবে বিক্ষোভকারীরা দাবি করছেন, উচ্ছেদের আগে যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য।
উচ্ছেদকেন্দ্রগুলো পরিদর্শনে গেলে কিছু জেন-জি কর্মীর ওপর হামলা, গ্রেপ্তার এবং আহত হওয়ার ঘটনাও অভিযোগ হিসেবে উঠে এসেছে। পাশাপাশি কাঠমান্ডুর তিনটি সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ের প্রবেশপথ গাড়ি পার্ক করে অবরুদ্ধ করার ঘটনাও জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন এবং সংসদেও উত্থাপিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবও বর্তমান সংকটকে জটিল করেছে। একই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে পৌর পুলিশ ও জাতীয় ট্রাফিক পুলিশের ভিন্ন আইন ও জরিমানা ব্যবস্থা জনসাধারণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, বালেন শাহ সরকারের প্রতি তরুণদের প্রত্যাশা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় সামান্য ব্যত্যয়ও দ্রুত অসন্তোষে পরিণত হচ্ছে। তবে তারা এটিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখছেন, যেখানে নাগরিকরা তাদের নির্বাচিত নেতৃত্বকে জবাবদিহির আওতায় আনতে চাইছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, চলমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের উচিত উচ্ছেদ কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত রেখে পুনর্বাসনের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।





