মায়ের ওপর অভিমান করে ৬৪ হাজার টাকা ও খেলনা নিয়ে ঘর ছাড়ল ৮ বছরের শিশু

মায়ের সামান্য বকুনি খেয়ে মাত্র ৮ বছরের এক শিশু যা ঘটিয়ে বসল, তা শুনে এখন রীতিমতো তোলপাড় নেট দুনিয়া। "থাকব না আর তোমাদের বাড়িতে, আমি চলে গেলাম।" ছোটবেলার এই চিরচেনা সংলাপটি শোনেননি এমন মানুষ সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাবা-মায়ের একটুখানি বকুনি কিংবা পছন্দের খেলনা না পেয়ে ঘর ছাড়ার মিথ্যা হুমকি আমরা অনেকেই শৈশবে দিয়েছি। সেই নিষ্পাপ অভিমান আর মজার গল্পগুলো আমাদের সবার স্মৃতির পাতায় জমা হয়ে আছে। কিন্তু মাদারীপুরের এক শিশুর ক্ষেত্রে এই অভিমান কেবল মুখেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা রূপ নিয়েছে এক অবিশ্বাস্য ও চমৎকার বাস্তবতায়।
শুনতে কোনো রূপকথার গল্প মনে হলেও ঘটনাটি একেবারে ধ্রুব সত্য। গত বুধবার মাদারীপুরের শিরখারা এলাকা থেকে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারে নেমে আসে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। ৮ বছরের এক শিশুর এমন সাহসী ও অবিশ্বাস্য কাণ্ড দেখে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেছেন এলাকাবাসীসহ খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও। মায়ের ওপর সামান্য একটু অভিমান করে সে ঘর ছাড়ল ঠিকই, কিন্তু মোটেও খালি হাতে নয়। নিজের সবচেয়ে প্রিয় খেলনাগুলোর পাশাপাশি সে সাথে করে নিয়ে গেল নগদ ৬৪ হাজার টাকারও বেশি অর্থ। এক-দুই হাজার নয়, রীতিমতো নগদ ৬৪,১২০ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায় এই খুদে অভিমানী।
নিখোঁজ হওয়ার ঠিক একদিন পর এই টানটান নাটকীয়তায় আসে এক স্বস্তির মোড়। মাদারীপুর সদর হাসপাতালের বহির্বিভাগে গভীর রাতে একাকী উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখে শিশুটিকে উদ্ধার করেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দায়িত্বরত সদস্যরা। সেখানে কর্মরত আনসার সদস্য মোহাম্মদ অন্তর মিয়া ও ক্যাম্প ইনচার্জ পিসি মুখলেসের তৎপরতায় শিশুটিকে দ্রুত নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপর তার সাথে থাকা ব্যাগটি তল্লাশি করতেই চক্ষু চড়কগাছ উপস্থিত সবার। ব্যাগের ভেতর প্রিয় খেলনাগুলোর সাথে থরে থরে সাজানো ছিল হাজার টাকার নোট।
তৎক্ষণাৎ বিষয়টি উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা মনির হোসেন এবং স্থানীয় থানায় অবহিত করা হয়। আনসার সদস্যরা শিশুটির সাথে কথা বলে তার পরিচয় জানার চেষ্টা করেন এবং একই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমের সহায়তা নেওয়া হয়। অবশেষে শুক্রবার রাতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে উদ্ধারকৃত নগদ ৬৪,১২০ টাকা এবং প্রিয় খেলনাসহ শিশুটিকে তার বাবা-মা ও চাচার কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কলিজার টুকরো সন্তানকে ফিরে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পরিবারটি।
শৈশবের সেই চিরন্তন প্রবাদ "যা বলি তোর ভালোর জন্যই বলি"—যেন আবারও প্রমাণিত হলো এই ঘটনার মাধ্যমে। ৮ বছরের একটি শিশুর পক্ষে এত বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়া এবং একা হাসপাতালে রাত কাটানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে আনসার সদস্যদের সময়োপযোগী পদক্ষেপ ও সততার কারণে কোনো বড় ধরনের বিপদ ছাড়াই শিশুটি তার পরিবারের কাছে ফিরতে পেরেছে। শৈশবের এই মধুর কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ অভিমান আমাদের সমাজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে যায়। সন্তানের প্রতি শাসন যেমন জরুরি, তেমনি তাদের কোমল মনের আবেগের দিকেও বাবা-মায়ের সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। সঠিক অভিভাবকত্ব আর মমতার বন্ধনই পারে আগামীর ভবিষ্যৎকে অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখতে।





