হান্টা ভাইরাস কী, কীভাবে ছড়ায় এবং কীভাবে নিরাপদ থাকবেন

সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক ক্রুজ জাহাজে হান্টা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজনের মৃত্যুর খবর বিশ্বজুড়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। করোনাভাইরাসের মতো দ্রুত সংক্রমণ না ছড়ালেও উচ্চ মৃত্যুহারের কারণে ভাইরাসটি নিয়ে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদারের মতে, হান্টা ভাইরাস একটি প্রাণীবাহিত সংক্রমণ, যা মূলত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়।
হান্টা ভাইরাস কী
হান্টা ভাইরাস মূলত একধরনের জুনোটিক ভাইরাস, অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। সাধারণত ইঁদুর ও এজাতীয় বন্য প্রাণীর মাধ্যমে এই ভাইরাস সংক্রমিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এটি কোনো একক ভাইরাস নয়; বরং একই ধরনের কয়েকটি ভাইরাসের সমষ্টি। বিভিন্ন অঞ্চলে এর ভিন্ন ভিন্ন ধরন ও নাম রয়েছে।
নামকরণের ইতিহাস
দক্ষিণ কোরিয়ার হান্টান নদীর নাম অনুসারে ভাইরাসটির নামকরণ করা হয়। ১৯৫০-এর দশকে কোরিয়ান যুদ্ধের সময় প্রথম ব্যাপকভাবে এই ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
পরে ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসটির একটি নতুন ধরন শনাক্ত হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘হান্টা ভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম’। এটি মানুষের ফুসফুসে মারাত্মক ক্ষতি করে।
যেভাবে ছড়ায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঁদুরের লালা, মূত্র ও মলের মাধ্যমে হান্টা ভাইরাস ছড়ায়। ইঁদুরের বর্জ্য শুকিয়ে ধুলার সঙ্গে বাতাসে মিশে গেলে সেই দূষিত বাতাস শ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
এ ছাড়া আক্রান্ত ইঁদুর কামড় দিলে কিংবা দূষিত খাবার গ্রহণ করলেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
তবে খুব বিরল ক্ষেত্রে ‘অ্যান্ডিস ভাইরাস’ নামের একটি ধরন মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে বলেও জানা গেছে।
কী ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়
হান্টা ভাইরাসের প্রধান দুটি ধরন রয়েছে—
এইচপিএস বা পালমোনারি সিনড্রোম
এই ধরনের সংক্রমণে ফুসফুসে পানি জমে যায় এবং তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।
এইচএফআরএস বা হেমোরেজিক ফিভার
এ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং শরীরে রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
প্রাথমিক অবস্থায় রোগটির উপসর্গ অনেকটা সাধারণ ফ্লুর মতো। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, পেশিতে ব্যথা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দেয়। কয়েক দিনের মধ্যে রোগীর শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে, কাশি শুরু হয় এবং রক্তচাপ কমে যেতে পারে।
মৃত্যুঝুঁকি কতটা
চিকিৎসকদের মতে, হান্টা ভাইরাস অত্যন্ত প্রাণঘাতী। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার ৩৮ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ প্রতি ১০ জন আক্রান্তের মধ্যে প্রায় চারজনের মৃত্যু হতে পারে।
শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা
রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হান্টা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি।
তবে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে রোগীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। গুরুতর রোগীদের আইসিইউতে রেখে অক্সিজেন সাপোর্টসহ বিভিন্ন সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
যেভাবে নিরাপদ থাকবেন
বিশেষজ্ঞরা হান্টা ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন—
- বাড়িঘর ও কর্মস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে
- ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে এমন স্থান পরিষ্কার করার সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে
- খাবার সব সময় ঢেকে রাখতে হবে
- পুরোনো বা বন্ধ ঘর পরিষ্কার করার সময় সরাসরি ঝাড়ু না দিয়ে ব্লিচিং পাউডার মেশানো পানি ব্যবহার করতে হবে, যাতে ধুলা বাতাসে না ছড়ায়
- শস্যদানা ও খাবার নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শুধু ইঁদুর মারার চেয়ে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই বেশি কার্যকর। কারণ পরিষ্কার ও পরিপাটি পরিবেশে ইঁদুরের বসবাসের সুযোগ কমে যায়।






