অতিরিক্ত হেডফোন ব্যবহারে বাড়ছে শ্রবণঝুঁকি, সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা

প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক জীবনে হেডফোন ও ইয়ারবাড এখন দৈনন্দিন ব্যবহারের অন্যতম অনুষঙ্গ। গান শোনা, অনলাইন ক্লাস, গেমিং কিংবা সামাজিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে এসব ডিভাইসের ব্যবহার। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দে হেডফোন ব্যবহারের কারণে স্থায়ী শ্রবণহানির ঝুঁকি বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে।
বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত ভলিউমে গান শোনার প্রবণতা ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ক্লেভল্যান্ড ক্লিনিক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঝুঁকি এখন শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়। স্মার্টফোন ও কম দামের ইয়ারফোন সহজলভ্য হওয়ায় গ্রাম ও আধা-শহুরে এলাকাতেও একই প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি এখন আর কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। ৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি ৮ জনের মধ্যে অন্তত ১ জন ইতোমধ্যে শব্দজনিত শ্রবণ সমস্যায় ভুগছে। দীর্ঘ সময় উচ্চ ভলিউমে হেডফোন ব্যবহারের কারণে এ সমস্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের আশঙ্কা, এখনই সচেতনতা বৃদ্ধি না হলে আগামী এক দশকে তরুণদের মধ্যে শ্রবণ সমস্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।
কানের ক্ষতি হয় যেভাবে
শ্রবণহানির প্রাথমিক লক্ষণ
কতটা শব্দ বিপজ্জনক
কিভাবে সুরক্ষিত রাখবেন কান
- দীর্ঘ সময়ের জন্য উচ্চ ভলিউম এড়িয়ে চলা
- সর্বোচ্চ ভলিউমের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে শব্দ সীমিত রাখা
- নির্দিষ্ট সময় পরপর বিরতি নেওয়া
- ভালো ফিটিং বা নয়েজ-ক্যানসেলিং ইয়ারফোন ব্যবহার করা
অডিও বিশেষজ্ঞ ভ্যালেরি পাভলোভিচ রাফ জানিয়েছেন, মানুষের শ্রবণশক্তি মূলত কানের ভেতরের সূক্ষ্ম অংশ ‘ককলিয়া’র ওপর নির্ভরশীল। সাপের মতো আকৃতির এই অংশে তরল ও ক্ষুদ্র চুলের মতো কোষ থাকে, যা শব্দ তরঙ্গকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়।
কিন্তু দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দে গান শোনা বা ক্রমাগত হেডফোন ব্যবহারের ফলে এই সূক্ষ্ম কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। একবার এসব কোষ নষ্ট হয়ে গেলে তা আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় না।
ফলে ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ শোনার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ায় অনেকে বিষয়টি গুরুত্ব দেন না।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, শব্দজনিত শ্রবণহানি সাধারণত হঠাৎ ঘটে না; এটি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
এর প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—ভিড়ের মধ্যে মানুষের কথা স্পষ্ট বুঝতে অসুবিধা হওয়া, উচ্চ স্বরের সূক্ষ্ম শব্দ শুনতে সমস্যা হওয়া এবং কানে ক্রমাগত ভোঁ ভোঁ বা ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ শোনা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই সমস্যাকে ‘টিনিটাস’ বলা হয়।
অনেকেই এসব লক্ষণকে সাময়িক ক্লান্তি বা মনোযোগের ঘাটতি মনে করে অবহেলা করেন। ফলে সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
শব্দের তীব্রতা পরিমাপ করা হয় ডেসিবেল এককে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দিনে সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ৮০ ডেসিবেল শব্দ তুলনামূলক নিরাপদ ধরা হয়। তবে এর বেশি শব্দ বা দীর্ঘ সময় এক্সপোজারে ঝুঁকি দ্রুত বাড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটের সর্বোচ্চ ভলিউম হেডফোনে ১১০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা মাত্র কয়েক মিনিটেই কানের ক্ষতি করতে সক্ষম।
তাদের মতে, আশপাশের কেউ যদি আপনার হেডফোনের শব্দ শুনতে পান, তাহলে বুঝতে হবে ভলিউম ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
হেডফোন ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—এর ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। ব্যথা বা দৃশ্যমান কোনো উপসর্গ না থাকায় অনেকেই দীর্ঘদিন ঝুঁকির মধ্যে থেকেও সচেতন হন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ তাদের শ্রবণব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি পরিণত হয়নি এবং তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সময় অডিও ডিভাইস ব্যবহার করে।
তারা বলছেন, প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ করা সমাধান নয়; বরং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
নিরাপদ ব্যবহারের জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন—
নয়েজ-ক্যানসেলিং ডিভাইস বাইরের শব্দ কমিয়ে দেয়, ফলে অতিরিক্ত ভলিউম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। তবে এসব ডিভাইস ব্যবহারের সময় যানবাহনের হর্ন বা সতর্ক সংকেত শোনা না যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই বাইরে চলাফেরার সময় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
এ ছাড়া বর্তমানে অনেক আধুনিক ডিভাইসে ভলিউম-লিমিটিং প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শব্দকে নিরাপদ মাত্রায় সীমাবদ্ধ রাখে। বিশেষজ্ঞরা এমন প্রযুক্তিসম্পন্ন ডিভাইস ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবার শ্রবণশক্তি হারিয়ে গেলে তা আর পুরোপুরি ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই শিশু-কিশোরসহ সব বয়সী মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
অডিও বিশেষজ্ঞ ভ্যালেরি পাভলোভিচ রাফ বলেন, “মানুষ জীবনে একবারই শ্রবণশক্তি পায়। তাই সেটি রক্ষা করতে হলে এখন থেকেই শব্দ ব্যবহারে সংযমী হতে হবে।”
ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি নিরাপদ অভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে শ্রবণশক্তি সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।





