বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ, ব্যারেলপ্রতি ৮৪ ডলার পার

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও তীব্র ঊর্ধ্বমুখী। আজ মঙ্গলবার তেলের আন্তর্জাতিক বাজার দর প্রায় ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এখন গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে।
গতকাল সোমবার ছিল পশ্চিমা দেশগুলোসহ বৈশ্বিক বাজারের সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস। দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি শেষে গতকাল বাজার খুলতেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম এক লাফে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে যায়। ২০২০ সালের মে মাসের পর বিশ্ববাজারে এক দিনে তেলের দাম এতটা বৃদ্ধির রেকর্ড আর ছিল না। সেই ধারাবাহিকতায় আজ সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনেও তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
আজ গ্রিনিচ মান সময় (জিএমটি) ১২টা ৫১ মিনিটে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১ দশমিক ৬৮ ডলার বা ২ শতাংশ বেড়ে ৮৪ দশমিক ৯৮ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও ২ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ৭৯ ডলারে ওঠে।
উল্লেখ্য, গত ১৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে এটিই বিশ্ববাজারে তেলের সর্বোচ্চ দাম।
মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে ইরানের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে অকার্যকর ঘোষণা করে নতুন করে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা শুরু করায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, এই সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আবারও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
স্বাভাবিকভাবেই এই উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালি’। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের ওপর আবারও কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ এবং এই সরু জলপথে উভয় দেশের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে।
গত সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, হরমুজ প্রণালির ওমান সীমানার দক্ষিণমুখী পথে আমিরাতের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এই হামলায় এক ভারতীয় নাবিক নিহত হন এবং আরও আটজন আহত হন। এই ঘটনার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান যে, ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ২০ শতাংশ মাশুল আদায় করবে এবং ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর অবরোধ পুনর্বহাল করবে।
বাজার বিশ্লেষকদের শঙ্কা ও বৈশ্বিক প্রভাব
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পুনর্বহাল এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি বন্ধ না হলেও দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে জ্বালানি সরবরাহের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানে তীব্র বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াইজেসি (YJC) জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার ভোরে দেশটির বন্দর আব্বাসে সাতটি এবং কিশ দ্বীপে আরও দুটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
সংঘাতের এই উত্তাপ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের ভেতরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। হুতিদের দাবি, সৌদি আরব তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে হামলা চালানোর প্রতিক্রিয়ায় তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। গ্যাবেলি ফান্ডসের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক সাইমন ওয়াং সতর্ক করে বলেন, “হুতিরা যদি লোহিত সাগরে সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশের তেলবাহী ট্যাংকারে নিয়মিত হামলা চালিয়ে যায়, তবে এই অঞ্চল থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ প্রক্রিয়া পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।”





