জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেলে কি মানুষ মোটা হয়?

জন্মনিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে মুখে খাওয়ার জন্মনিরোধক বড়ি বা ওরাল পিলের ব্যবহার শুরু হয়েছে এক শতাব্দীরও কম সময় আগে। ১৯৬০ সালের ৯ মে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন প্রথম এ ধরনের বড়ির অনুমোদন দেয়। এরপর গত কয়েক দশকে নারীর জন্মনিয়ন্ত্রণ ও স্ত্রীরোগসংক্রান্ত নানা সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এই পদ্ধতি।
প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্রেই এই পিল উদ্ভাবন করা হয় এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে এর কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়।
জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি কী এবং কীভাবে কাজ করে
জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি মূলত নারীদের জন্য তৈরি একটি হরমোনজাত ওষুধ। এতে থাকা হরমোন ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নিঃসরণে বাধা দেয়, ফলে গর্ভধারণ প্রতিরোধ হয়। অধিকাংশ পিলে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টিন নামের দুটি হরমোন থাকে।
এই পিলের প্রধান কাজ হলো ডিম্বস্ফোটন বন্ধ রাখা এবং মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা। চিকিৎসকদের মতে, নিয়ম মেনে পিল গ্রহণ করলে প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বাজারে সাধারণত তিন ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি পাওয়া যায়— কম্বাইন্ড পিল, প্রোজেস্টিন-নির্ভর মিনিপিল এবং জরুরি পিল। এর মধ্যে কম্বাইন্ড পিল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
আধুনিক পিলগুলোতে হরমোনের মাত্রা আগের তুলনায় অনেক কম, ফলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।
পিল খেলে কি মোটা হওয়া যায়?
অনেক নারীর মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা হলো— জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেলে ওজন বেড়ে যায়। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এ ধারণার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
কিছু ক্ষেত্রে পিল সেবনের পর সাময়িকভাবে ওজন বাড়তে পারে। তবে তা সাধারণত শরীরে জলীয় পদার্থ জমে থাকার কারণে হয়। এই অবস্থা স্থায়ী নয় এবং কয়েক মাসের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের প্রজন্মের পিলগুলোতে হরমোনের মাত্রা বেশি থাকায় ক্ষুধা বৃদ্ধি ও শরীরে পানি জমার প্রবণতা দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে ব্যবহৃত তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের পিলগুলোতে এসব সমস্যা অনেকটাই কম।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির কারণে স্থায়ীভাবে মোটা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই।
মুড সুইং বা মানসিক পরিবর্তন
জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবনের ফলে কিছু নারীর আচরণে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে, যাকে সাধারণভাবে মুড সুইং বলা হয়। মস্তিষ্কের যে অংশ মেজাজ, ঘুম ও ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে, সেই অংশে হরমোনের প্রভাব পড়ার কারণে এমনটি হতে পারে।
তবে আধুনিক স্বল্পমাত্রার পিল ব্যবহারে এ ধরনের সমস্যা আগের তুলনায় অনেক কম দেখা যায় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
মাসিক সংক্রান্ত প্রভাব
জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি শুধু গর্ভধারণ প্রতিরোধেই নয়, মাসিকের অনিয়ম, অতিরিক্ত রক্তস্রাব, তলপেটে ব্যথা ইত্যাদি সমস্যার চিকিৎসাতেও ব্যবহৃত হয়। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে এটি অন্যান্য স্ত্রীরোগের চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হয়।
যদিও অনেকের মধ্যে ধারণা রয়েছে— পিল খেলে মাসিকের সমস্যা হয়। তবে চিকিৎসকদের মতে, এই ধারণা সঠিক নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে পিল মাসিক নিয়মিত করতে সাহায্য করে।
নিয়মিত পিল ও জরুরি পিলের পার্থক্য
নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি প্রতিদিন নির্দিষ্ট নিয়মে খেতে হয়। অন্যদিকে জরুরি পিল বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন সুরক্ষাহীন শারীরিক সম্পর্কের পর গর্ভধারণ রোধে ব্যবহৃত হয়।
জরুরি পিল সাধারণত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে, অর্থাৎ শারীরিক সম্পর্কের পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রহণ করতে হয়, যদিও কিছু ক্ষেত্রে পাঁচ দিনের মধ্যেও কার্যকর থাকতে পারে।
সন্তান ধারণের সক্ষমতায় প্রভাব পড়ে কি?
আরেকটি প্রচলিত প্রশ্ন হলো— জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি খেলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের ক্ষমতা কমে যায় কি না। চিকিৎসকদের মতে, এ ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
পিল বন্ধ করার পর সাময়িকভাবে মাসিক শুরু হতে দেরি হতে পারে, তবে প্রজননক্ষমতা সাধারণত ফিরে আসে।
কখন সতর্কতা প্রয়োজন
কিছু ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবনে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়। যেমন— ৪০ বছরের বেশি বয়স, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা, লিভারের রোগ, স্তন ক্যানসার বা হৃদরোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া পিল সেবন করা উচিত নয়।
এ ছাড়া বড় কোনো অস্ত্রোপচারের আগে বা অন্য জটিল শারীরিক অবস্থায় পিল গ্রহণের বিষয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি নিরাপদ ও কার্যকর হলেও সঠিক নিয়ম মেনে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।





