হামের চিকিৎসায় বিপর্যস্ত পরিবার, ঋণ ও আয়হীনতায় বাড়ছে দুর্ভোগ

দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা করাতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়ছে হাজারো পরিবার। এক হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা না মেলায় অভিভাবকদের একাধিক হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয়, যাতায়াত খরচ, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দীর্ঘ সময় হাসপাতালে অবস্থানের কারণে অনেক পরিবার ঋণের বোঝায় ডুবে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সন্তানের পাশে থাকতে গিয়ে বহু অভিভাবকের উপার্জনের পথও বন্ধ হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। অথচ এই অর্থনৈতিক চাপ কমাতে কার্যকর কোনো জাতীয় পরিকল্পনা এখনো গড়ে ওঠেনি।
হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটে নিঃস্ব পরিবার
পিরোজপুরের জাকির হোসেনের এক বছর বয়সী ছেলে গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে ১ মার্চ ছাড়পত্র দেওয়া হলেও সেখানে শিশুটির ব্রঙ্কাইটিস ও রক্তস্বল্পতার কথা উল্লেখ ছিল। বাড়ি ফেরার মাত্র দুই দিনের মাথায় আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশুটি।
এরপর থেকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে পরিবারটিকে। প্রথমে বরিশালে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়, পরে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে শিশুটির নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। কয়েক দিন চিকিৎসার পর বাড়ি পাঠানো হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি।
পরবর্তীতে খুলনার একটি বেসরকারি ক্লিনিকে পরীক্ষায় হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এরপর আবার পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় শিশুটিকে। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে ঢাকায় আনা হয়। ৩ মে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে একই রাতে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
জাকির হোসেন জানান, ছেলের চিকিৎসায় এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে তার ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষিকাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে বৃষ্টিতে এক থেকে দেড় লাখ টাকার ধানও নষ্ট হয়েছে।
তিনি বলেন, “ছেলের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও চিকিৎসকেরা বলছেন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা লাগবে। এখন বুঝতে পারছি না কীভাবে সব সামাল দেব।”
বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে অন্তত ৫৯ হাজার শিশু হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪২৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার শিশু। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে ৩৩ হাজারের বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশ পরিবারের জন্য চিকিৎসা ব্যয় এখন বড় ধরনের চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি হাসপাতালে কম খরচ, তবু বাড়ছে ব্যয়
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা তুলনামূলক কম খরচে হলেও বাস্তবে অধিকাংশ ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।
শিশুদের নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে অনেক ক্ষেত্রেই একাধিক হাসপাতালে নিতে হচ্ছে। কোথাও শয্যা না পেয়ে আইসিইউ বা পিআইসিইউর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড হাসপাতালে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৪২৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২১০ শিশু।
ফরিদপুরের ভ্যানচালক আবির শেখ তার ১১ মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন। এর আগে তিনি ফরিদপুরের কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা করান। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাজধানীতে আসতে বাধ্য হন।
তিনি জানান, চিকিৎসার পেছনে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে, যার বেশির ভাগই ধার করে জোগাড় করতে হয়েছে।
অন্যদিকে যশোর থেকে পাঁচ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন কেফায়েতুল্লাহ। তিনি বলেন, একাধিক হাসপাতালে ঘুরেও আইসিইউ শয্যা পাননি। শেষ পর্যন্ত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করালেও সেখানে শয্যা সংকটের কারণে বারান্দায় চিকিৎসা চলছে।
চিকিৎসা ব্যয়ে বাড়ছে অর্থনৈতিক বোঝা
হামের চিকিৎসায় পরিবারগুলোর প্রকৃত ব্যয় নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে ২০২০ সালে স্প্রিঙ্গার নেচারের বিএমসি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী হামে আক্রান্ত একটি শিশুর হাসপাতালে চিকিৎসায় গড়ে ১৫৯ মার্কিন ডলার ব্যয় হতো। এর প্রায় অর্ধেক বহন করত পরিবারগুলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যয় আরও বেড়েছে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই একটি শিশুর চিকিৎসায় ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। আইসিইউ প্রয়োজন হলে কিংবা একাধিক হাসপাতালে ঘুরতে হলে ব্যয় আরও কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৯ শতাংশই জনগণের পকেট থেকে
সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষকে নিজস্ব অর্থে বহন করতে হয়। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন সংস্থার মতে, বাস্তবে এই হার আরও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জটিল রোগের চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে বহু পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সাইফুন নাহিন শিমুল বলেন, “চিকিৎসা ব্যয় এবং পরিবারগুলোর আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি এখনো যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। শিশুর অসুস্থতার কারণে অভিভাবকদের আয় বন্ধ হয়ে যায়। আবার দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থার কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের হাসপাতালে রোগী ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত খরচে চিকিৎসা গ্রহণ বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করলেও তা কমাতে কার্যকর পরিকল্পনা নেই। স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার ও রেফারেল ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ইলেক্ট) অধ্যাপক আবু জামিল ফয়সাল বলেন, “হামের ব্যাপক সংক্রমণের কারণে পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে। হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে মানুষ আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনসহ মৌলিক চিকিৎসাসুবিধা আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা গেলে অনেক রোগীকেই বড় শহরে ছুটতে হতো না। পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং রোগীর স্বজনদের সঙ্গে মানবিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।





