রোগী যখন প্রশ্ন করেন, হাসপাতালের দায়িত্ব তখনই শুরু

মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর
এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম
স্বাস্থ্যসেবায় একটি প্রশ্নকে আমরা অনেক সময় খুব সাধারণভাবে দেখি—“এই রোগের চিকিৎসা কোথায় হবে?”
কিন্তু একজন রোগী বা তাঁর পরিবারের কাছে এই প্রশ্নের পেছনে থাকে আরও অনেক প্রশ্ন।
কোন চিকিৎসকের কাছে যাব? কত দ্রুত দেখা দরকার? কী পরীক্ষা লাগতে পারে? কোথা থেকে শুরু করব? আগের রিপোর্ট সঙ্গে নিতে হবে কি? চিকিৎসার পর কী করতে হবে?
স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করতে গিয়ে আমার কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—রোগীর প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং সহজভাবে উত্তর দেওয়া নিজেই একটি সেবা।
একজন মানুষ যখন হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন তিনি সবসময় চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় প্রশ্ন করেন না। অনেক সময় তিনি শুধু নিজের পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করেন।
কেউ বলেন, “আমার বাবার কয়েকদিন ধরে শ্বাসকষ্ট।”
কেউ বলেন, “আমার সন্তানের এই সমস্যা হচ্ছে, কোন ডাক্তার দেখাব?”
আবার কেউ হয়তো শুধু জানতে চান, “এখন আমার কী করা উচিত?”
এই প্রশ্নগুলোর পেছনে থাকে উদ্বেগ। তাই শুধু তথ্য দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তথ্যটি এমনভাবে দিতে হয়, যাতে মানুষ বুঝতে পারেন তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী।
এখানেই স্বাস্থ্যসেবার যোগাযোগের গুরুত্ব।
একটি হাসপাতালের ওয়েবসাইটে অনেক তথ্য থাকতে পারে। চিকিৎসকের প্রোফাইল, বিভিন্ন বিভাগ, চিকিৎসাসেবা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা অ্যাপয়েন্টমেন্টের তথ্য—সবই সেখানে থাকতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ মানুষ কি প্রয়োজনের সময়ে সেই তথ্য সহজে খুঁজে পাচ্ছেন?
তথ্য থাকা এবং তথ্য খুঁজে পাওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একজন রোগী হয়তো প্রথমে গুগলে একটি রোগের নাম লিখলেন। তারপর কোনো চিকিৎসকের নাম খুঁজলেন, হাসপাতালের ওয়েবসাইট দেখলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য পড়লেন এবং শেষে ফোন করলেন।
এই পুরো পথের প্রতিটি ধাপে প্রতিষ্ঠানটি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
তাই একটি হাসপাতালের Brand শুধু বিজ্ঞাপন বা প্রচারণায় তৈরি হয় না। তৈরি হয় একজন মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ধরনেও।
একটি ফোনকলের কথোপকথনও Brand Experience হতে পারে।
একজন রোগী যদি পাঁচ মিনিটের একটি ফোনকল শেষে বুঝতে পারেন—কোথায় যেতে হবে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী—তাহলে সেই যোগাযোগ তাঁর অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমাতে পারে।
অন্যদিকে, যদি তিনি একাধিক জায়গায় ফোন করেন, একই তথ্য বারবার দেন কিংবা কোথা থেকে সঠিক তথ্য পাবেন তা বুঝতে না পারেন, তাহলে ছোট একটি যোগাযোগের সমস্যা পুরো অভিজ্ঞতাকে কঠিন করে তুলতে পারে।
এখানে Call Centre-এর ভূমিকাও শুধু ফোন ধরা বা তথ্য দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
মানুষ কী প্রশ্ন করছেন, কোন তথ্য বারবার জানতে চাইছেন এবং কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছেন—এসবই একটি হাসপাতালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
একটি প্রশ্ন যদি বারবার আসে, তাহলে শুধু উত্তর দেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রশ্নটি কেন বারবার তৈরি হচ্ছে, সেটিও খুঁজে দেখা দরকার।
হয়তো ওয়েবসাইটে তথ্যটি সহজভাবে দেওয়া নেই।
হয়তো কোনো প্রক্রিয়া রোগীর কাছে পরিষ্কার নয়।
হয়তো একটি বিভাগ সম্পর্কে মানুষের ধারণা অসম্পূর্ণ।
এখানেই যোগাযোগের সঙ্গে ব্যবস্থাপনার সম্পর্ক তৈরি হয়।
আমার দৃষ্টিতে, ভালো স্বাস্থ্যসেবা যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—মানুষকে শুধু তথ্য দেওয়া নয়, তাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা।
তবে এর অর্থ রোগীর হয়ে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। বরং কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন, কোন তথ্য সঙ্গে রাখা দরকার, কোথায় যোগাযোগ করতে হবে এবং পরবর্তী ধাপ কী—এসব বিষয় পরিষ্কার করতে সাহায্য করা।
স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্টের ক্ষেত্রেও একই দায়িত্ব রয়েছে। একটি পোস্ট ভাইরাল হওয়া ভালো। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেটি কি মানুষের কোনো বাস্তব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে?
স্বাস্থ্য নিয়ে ভয় তৈরি করে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ। কিন্তু দায়িত্বশীল যোগাযোগের লক্ষ্য হওয়া উচিত আতঙ্ক তৈরি করা নয়; বরং মানুষকে নির্ভরযোগ্য তথ্যের দিকে নিয়ে যাওয়া।
কারণ স্বাস্থ্যসেবায় একটি ভুল ধারণার প্রভাব অনেক বড় হতে পারে।
আমার কাছে ভবিষ্যতের Healthcare Communication-এর বড় পরিবর্তন এখানেই—আমাদের শুধু ভাবলে হবে না, “আমরা কী বলতে চাই?”
আমাদের জানতে হবে—
“মানুষ কী জানতে চাইছে?”
এই দুই প্রশ্নের মধ্যে পার্থক্য অনেক।
একটি প্রতিষ্ঠান নিজের সেবা সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারে। কিন্তু রোগী যদি অন্য কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকেন, তাহলে যোগাযোগ যত বড়ই হোক, সেটি কার্যকর নাওহতে পারে।
শেষ পর্যন্ত একজন রোগী হয়তো কোনো হাসপাতালের বিজ্ঞাপনের প্রতিটি কথা মনে রাখবেন না।
কিন্তু তিনি মনে রাখবেন—প্রয়োজনের সময়ে তাঁর প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গিয়েছিল কি না।
কেউ তাঁর কথা শুনেছিল কি না।
কেউ তাঁকে পরবর্তী পদক্ষেপ বুঝতে সাহায্য করেছিল কি না।
স্বাস্থ্যসেবায় ভালো যোগাযোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—একজন মানুষ যেন যোগাযোগ শেষ করার পর আগের চেয়ে একটু বেশি পরিষ্কার ধারণা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন।
কারণ একজন রোগীর কাছে সঠিক তথ্য শুধু তথ্য নয়।
সঠিক সময়ে সঠিকভাবে দেওয়া তথ্য অনেক সময় একটি কঠিন সিদ্ধান্তকে সহজ করে দিতে পারে।





