ইরান যুদ্ধ থেকে বেরোতে কি চীনের সহায়তা চাইছেন ট্রাম্প?

দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো চীন সফরে গেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সফরকে ঘিরে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের জটিল সমীকরণ। প্রতিযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার এই সম্পর্ক এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে।
বাণিজ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও তাইওয়ান—বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে নানা বিষয় থাকলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইরান সংকট। কারণ, দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় চাপ তৈরি করছে।
যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন ট্রাম্প
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইরান সংঘাত দ্রুত শেষ করার পথ খুঁজছে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ক্লান্তি তৈরি করেছে। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় নতুন করে যুদ্ধের চাপ নিতে সাধারণ মানুষও আগ্রহী নয়।
প্রতিরক্ষা খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান লাভবান হলেও সাধারণ মার্কিন নাগরিকের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাব নেই। ফলে ট্রাম্প এমন একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছেন, যাতে তিনি শুধু যুদ্ধ শুরু করেন না, প্রয়োজনে তা শেষও করতে পারেন—এমন ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা পায়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে চীন
এই বাস্তবতায় চীনের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। চীন সাধারণত প্রকাশ্যে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে না; বরং পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখে।
ফলে তেহরানের কাছে চীনের গ্রহণযোগ্যতা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইরানের ওপর পরোক্ষ চাপ তৈরিতে চীনের সহায়তা চাইতে পারে ওয়াশিংটন।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীন কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনায় কাজ করবে না। তারা চাইলে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, কিন্তু তা হবে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার বিবেচনায়।
ট্রাম্পের সফর কি বাস্তবতার স্বীকৃতি?
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ট্রাম্পের এই সফর বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতারও প্রতিফলন। যে যুক্তরাষ্ট্র এত দিন বৈশ্বিক নেতৃত্বের একক দাবিদার ছিল, এখন গুরুত্বপূর্ণ সংকট মোকাবিলায় তাকে চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সহযোগিতার দিকেও তাকাতে হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়েও চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তি, ড্রোন ও অস্ত্র তৈরিতে প্রয়োজনীয় বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’ সরবরাহে চীনের আধিপত্য রয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রেও বেইজিংকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, চীন আবারও বড় পরিসরে মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি করুক। সয়াবিন, ভুট্টা ও শূকরের মাংসের মতো পণ্যের বাজার পুনরুদ্ধারে ওয়াশিংটনের আগ্রহ বাড়ছে।
বাণিজ্যে দ্বৈত অবস্থান
তবে বাণিজ্য ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানে স্পষ্ট টানাপোড়েন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে চীনের বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর দাবি তুলছে, অন্যদিকে নিজেদের বাজারে চীনা পণ্য ও বিনিয়োগের ওপর নানা সীমাবদ্ধতা বজায় রেখেছে।
চীনও পাল্টা বার্তা দিচ্ছে—যদি সত্যিই মুক্ত বাণিজ্যে বিশ্বাস থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের বাজার আরও উন্মুক্ত করতে হবে। চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা কমানোর দাবিও তুলতে পারে বেইজিং।
তাইওয়ান প্রশ্নে বাড়তে পারে চাপ
এই বৈঠকে তাইওয়ান প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। চীন বরাবরই তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে এবং যেকোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থানের বিরোধিতা করছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বেইজিং চাইবে ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানান যে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না।
তবে ট্রাম্পের জন্য এমন অবস্থান নেওয়া সহজ হবে না। মার্কিন কংগ্রেস ও প্রতিরক্ষা মহলের বিরোধিতার মুখে নির্বাচনের আগে এ ধরনের মন্তব্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থার ইঙ্গিত
সব মিলিয়ে এই সফর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্ব এখন আর একক পরাশক্তিনির্ভর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আগের তুলনায় কমলেও চীনও সরাসরি একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটছে না।
বরং বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বড় শক্তিগুলোকে পারস্পরিক সমঝোতার পথেই এগোতে হচ্ছে। চীন নিজেকে এমন একটি শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, যে বিশ্বব্যবস্থার অংশ হতে চায়—তার নিয়ন্ত্রক নয়।
এ কারণেই বেইজিং মুক্ত বাণিজ্য ও সহযোগিতার বার্তা দিচ্ছে, যখন ওয়াশিংটন শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার কৌশল অব্যাহত রেখেছে।
তাৎক্ষণিক সমাধান নয়, তবু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরেই সব সংকটের সমাধান হবে—এমন আশা বাস্তবসম্মত নয়। বাণিজ্য বিরোধ, তাইওয়ান ইস্যু কিংবা ইরান যুদ্ধ—কোনোটিই তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
তবে বৈঠকটির গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ একা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না—এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও নয়।
এখন দেখার বিষয়, নিজেদের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেছনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন অন্তত বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতার বাস্তবতা কতটা উপলব্ধি করতে পারে।





