ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ‘অভিশাপ’ ভেঙে কি শিরোপা ধরে রাখতে পারবে আর্জেন্টিনা?

বিশ্বকাপের উত্তেজনা যখন ধীরে ধীরে চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছে, তখন ফুটবল বিশ্বে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি পুরোনো পরিসংখ্যান। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান দখল করে ২০২৬ বিশ্বকাপে নামতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে এই অবস্থানই এখন দলটির সামনে নতুন এক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল হিসেবে কি তারা বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসের একটি দীর্ঘদিনের ধারা ভাঙতে পারবে?
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিরতিতে দারুণ সময় কাটিয়েছে আর্জেন্টিনা। হন্ডুরাস ও আইসল্যান্ডের বিপক্ষে টানা জয় তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে। একই সময়ে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্স ও স্পেন পয়েন্ট হারানোয় লাভবান হয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল।
ফ্রান্স আইভরি কোস্টের কাছে হেরে গেলেও স্পেন ড্র করে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট খুইয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করেছে আর্জেন্টিনা। বর্তমানে ১৮৭৭ দশমিক ২৭ পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বের এক নম্বর দল আলবিসেলেস্তেরা।
তবে এই অর্জনের মধ্যেও লুকিয়ে আছে একটি অস্বস্তিকর পরিসংখ্যান। ১৯৯২ সালে ফিফা র্যাঙ্কিং চালুর পর এখন পর্যন্ত কোনো দলই র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর অবস্থানে থেকে বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। এ কারণেই ফুটবল অঙ্গনে অনেকের কাছে শীর্ষস্থানটিকে ‘অভিশপ্ত সিংহাসন’ হিসেবে দেখা হয়।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিশ্বকাপের আগে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা অনেক শক্তিশালী দলই শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়েছে। ১৯৯৪ সালে জার্মানি, ১৯৯৮ ও ২০১০ সালে ব্রাজিল, ২০০২ সালে ফ্রান্স এবং ২০১৪ সালে স্পেন শীর্ষস্থান নিয়ে বিশ্বকাপে এলেও শিরোপা জিততে পারেনি। সর্বশেষ কাতার বিশ্বকাপেও এক নম্বর দল হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল ব্রাজিল, কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের।
তবে বর্তমান আর্জেন্টিনাকে অনেকেই ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছেন। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে দলটি গত কয়েক বছরে অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তা এবং ধারাবাহিকতা প্রদর্শন করেছে। কাতার বিশ্বকাপে দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে শিরোপা জয়ের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে, পরিসংখ্যানের চেয়ে মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইনজুরি কাটিয়ে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির প্রত্যাবর্তন এবং গোল করে নতুন রেকর্ড গড়া দলের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে। অভিজ্ঞ তারকাদের পাশাপাশি তরুণ ফুটবলারদের উপস্থিতিও আর্জেন্টিনার শক্তি বাড়িয়েছে।
কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে গড়ে ওঠা এই দলে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের চমৎকার সমন্বয় রয়েছে। ভ্যালেন্টিন বার্কো, থিয়াগো আলমাদার মতো তরুণরা দলে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। বিশ্বকাপের আগে টানা সাত জয় এবং প্রস্তুতি ম্যাচে আইসল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারানো আর্জেন্টিনার বর্তমান ছন্দেরই প্রমাণ।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের এই পরিসংখ্যানকে কেউ কেউ নিছক কাকতালীয় ঘটনা মনে করলেও ফুটবলে ইতিহাস এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—আর্জেন্টিনা কি পারবে প্রায় তিন দশকের এই পরিসংখ্যানগত বাধা ভেঙে বিশ্বকাপের মুকুট ধরে রাখতে?
আর্জেন্টাইন সমর্থকদের বিশ্বাস, কাতারে লেখা রূপকথার নতুন অধ্যায় দেখা যেতে পারে ২০২৬ বিশ্বকাপেও। তাদের কাছে র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর অবস্থান কোনো চাপ নয়, বরং বাড়তি অনুপ্রেরণা।
এবারের বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ দিয়েই যাত্রা শুরু করবে আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচ থেকেই শুরু হবে আরেকটি ইতিহাস লেখার মিশন। বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের নজর এখন সেদিকেই—লিওনেল মেসি ও তার দল কি পারবেন ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের তথাকথিত ‘অভিশাপ’ ভেঙে আবারও বিশ্ব ফুটবলের সিংহাসনে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে?





