কুরবানির চামড়ার বাজারে ধসের পেছনে পাঁচ প্রধান কারণ

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত চামড়াশিল্প বর্তমানে গভীর সংকটে পড়েছে। কুরবানির ঈদকে ঘিরে যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠত, তা এখন অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। ঈদের আগমুহূর্তেও বাজারে নেই আগের মতো চাঞ্চল্য, যা খাতটির দুরবস্থাকেই স্পষ্ট করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তীব্র মূলধন সংকট, মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের প্রভাবসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে এই খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কুরবানির কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস নামার আশঙ্কার পেছনে মূলত পাঁচটি কারণ দায়ী।
প্রথমত, তারল্য সংকট ও ব্যাংকঋণের সীমাবদ্ধতা। পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা নগদ অর্থের অভাবে ভুগছেন। কয়েক বছর ধরে কাঁচা চামড়া কেনার জন্য ব্যাংক ঋণ বিতরণও কমে এসেছে। অধিকাংশ ব্যবসায়ী ঋণ খেলাপি হওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, সাভারের চামড়া শিল্পনগরের কাঠামোগত ব্যর্থতা। স্থানান্তরের পর থেকে পরিবেশগত নানা সমস্যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের চামড়ার গ্রহণযোগ্যতা কমেছে।
তৃতীয়ত, লবণ ও রাসায়নিকের মূল্যবৃদ্ধি। চামড়া সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় এসব উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
চতুর্থত, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। বাজারে সরাসরি প্রতিযোগিতা কম থাকায় তারা দাম নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ন্যায্য মূল্য পান না।
পঞ্চমত, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতার অভাব। অনেকেই সঠিকভাবে চামড়া সংরক্ষণ ও বাজারজাত করতে না পারায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন, যা সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
এ অবস্থায় সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারির কথা জানানো হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে চামড়া নিয়ে কোনো ধরনের কারসাজি ঠেকাতে নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়ে চামড়া পাচার রোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বছর ঢাকার ভেতরে গরুর কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। ঢাকার বাইরে এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। সে হিসাবে একটি গরুর চামড়ার দাম প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে কয়েক বছর ধরে এই চামড়া ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি বিক্রি হচ্ছে না।
অন্যদিকে বকরির চামড়ার বাজার আরও দুর্বল, অনেক ক্ষেত্রেই তা বিক্রিই হচ্ছে না। কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোই মূলত এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
খাতসংশ্লিষ্টরা আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে এখনো পিছিয়ে রয়েছে দেশ। বিশেষ করে সাভারের ট্যানারিগুলোতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
প্রতি বছর কুরবানির আগে বিশেষ ঋণ সুবিধার ঘোষণা এলেও বাস্তবে অধিকাংশ ট্যানারি মালিক তা পান না। ফলে আড়তদাররা পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনতে পারেন না, যা বাজারকে আরও অস্থির করে তোলে।
এ বছর চামড়া সংরক্ষণে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২২৮ কোটি টাকা। তবে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ১০০ কোটির নিচেই থেকে যেতে পারে।





