লেবাননের ৯০০ বছরের পুরোনো বিউফোর্ট দুর্গ কী, কেন দখল করল ইসরায়েল

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক বিউফোর্ট দুর্গ দখল করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের মধ্যেই এই কৌশলগত স্থাপনাটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেয় ইসরায়েল।
রোববার যুদ্ধবিরতি আলোচনা চলাকালেই দুর্গটি দখলের বিষয়টি সামনে আসে। ওই দিন এক অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেন, গ্যালিলি অঞ্চলের জনপদের ওপর নজরদারিতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়চূড়াগুলোতে আবারও ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিউফোর্ট দুর্গের নিয়ন্ত্রণ বহুবার হাতবদল হয়েছে। ক্রুসেডারদের সময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি ও অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল এই দুর্গ। উঁচু পাহাড়ে অবস্থানের কারণে এটি দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
বিউফোর্ট দুর্গের পরিচয়
বিউফোর্ট দুর্গ, যা আরবিতে কালাত আল-শাকিফ নামে পরিচিত, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭০০ মিটার উঁচু একটি পাথুরে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। দ্বাদশ শতকে ক্রুসেডাররা এই দুর্গ নির্মাণ করে। এখান থেকে লিতানি নদীসহ বিস্তীর্ণ এলাকার ওপর নজর রাখা যায়।
ক্রুসেডারদের দেওয়া ‘বিউফোর্ট’ নামটির অর্থ ‘সুন্দর দুর্গ’। তবে এর সৌন্দর্যের পাশাপাশি কৌশলগত অবস্থানই এটিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দুর্গটি বিভিন্ন শক্তির নিয়ন্ত্রণে যায়। সাম্প্রতিক সময়েও এটি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানের সময়ও দুর্গটি দখল করা হয়েছিল। পরে ২০০০ সালে ওই এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই দুর্গ
নাবাতিয়েহ শহরের কাছে অবস্থিত এই দুর্গটি দক্ষিণ লেবাননের অন্যতম কৌশলগত উচ্চভূমি। এখান থেকে আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, এমনকি উত্তর ইসরায়েল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
দুর্গটি দখলের মাধ্যমে ইসরায়েল কার্যত একটি গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি কেন্দ্র পেয়েছে। এতে দক্ষিণ লেবাননের সামরিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিপক্ষের গতিবিধি শনাক্ত করা সহজ হবে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, এই অভিযান মূলত হিজবুল্লাহর অবকাঠামো দুর্বল করা এবং সীমান্তের কাছাকাছি কৌশলগত উঁচু স্থানগুলো নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অংশ।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, বিউফোর্ট দুর্গ দখলের ফলে ইসরায়েলি বাহিনী উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে। এখান থেকে নাবাতিয়েহ অঞ্চল, পশ্চিম বেকা উপত্যকা, গোলান মালভূমি এবং উত্তর গ্যালিলি পর্যন্ত নজরদারি সম্ভব।
দক্ষিণ লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে ইসরায়েলি হামলায় হাজারো মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন।
কয়েক দিন ধরে বিমান হামলা ও স্থল অভিযানের পর ইসরায়েলি বাহিনী বিউফোর্ট দুর্গের দিকে অগ্রসর হয় এবং হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন গ্রাম থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, নতুন সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিউফোর্ট দুর্গ দখল কেবল একটি সামরিক অর্জন নয়, বরং পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এতে লেবানন–ইসরায়েল সীমান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।





