দাপুটে রাজনীতিক তোফায়েল আহমেদ: শেষ জীবনে দলীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা এক অধ্যায়

ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্ররাজনীতির ভেতর দিয়ে উঠে আসা তোফায়েল আহমেদ ছিলেন উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নেতা। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই রাজনীতিক স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতৃত্বে ছিলেন। তবে জীবনের শেষভাগে এসে দলীয় রাজনীতিতে তিনি অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
বেশ কয়েক বছর জনসমক্ষে কম দেখা যেত তাঁকে। অবশেষে সোমবার (১ জুন) ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তোফায়েল আহমেদ একটি পরিচিত ও প্রভাবশালী নাম। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। একই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তিনি।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনীর অন্যতম নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় ৩৩ মাস কারাবন্দি থাকার পর মুক্ত হয়ে তিনি দল পুনর্গঠন এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনি সামনের সারির নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তোফায়েল আহমেদ। পরে ২০১৪ সালেও বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ২০০৮ সালের পর গঠিত প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিসভায় তিনি স্থান পাননি। ২০১৮ সালের পরও তাঁকে মন্ত্রিসভার বাইরে রাখা হয়।
রাজনৈতিক জীবনের শেষদিকে তাঁর প্রভাব কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। ঘনিষ্ঠজনদের মতে, দলীয় রাজনীতিতে ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ায় তিনি মানসিকভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আশির দশকের শেষদিকে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়। এর পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা থাকলেও দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে এই শীতল সম্পর্ক তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানে প্রভাব ফেলেছিল।
এ ছাড়া এক-এগারোর সময় দলের ভেতরে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পাওয়াও তাঁর জন্য পরবর্তী সময়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ওই সময় দলের ভেতরে সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়ায় তিনি এবং আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা সমালোচনার মুখে পড়েন। পরবর্তীতে এই পরিচয় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তোলে বলে মনে করেন অনেকেই।
দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য থেকে সর্বশেষ উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নীতিনির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল সীমিত। তবু জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন তিনি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাওয়া তোফায়েল আহমেদের শেষ অধ্যায় তাই হয়ে আছে এক ধরনের নিভৃত ও কোণঠাসা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।





