জাতীয় সরকার প্রশ্নে বিএনপিকে ঘিরে শরিকদের অসন্তোষ

জাতীয় সরকার গঠন নিয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ঘিরে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রতি তাদের যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের মধ্যে ক্রমেই অসন্তোষ বাড়ছে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ঘাটতির অভিযোগ তুলে শরিক নেতারা বলছেন, ‘জাতীয় সরকার’ ধারণাটি এখনো বাস্তবে দৃশ্যমান হয়নি; বরং এককভাবে সরকার পরিচালনার প্রবণতাই বেশি লক্ষণীয়।
২০২২ সালের ২৯ মার্চ লন্ডনে যুক্তরাজ্য বিএনপির আয়োজনে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এক আলোচনায় বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন শেষে বিজয়ী ও গণতন্ত্রপন্থী সব দলকে নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। পরে এই বক্তব্য দলটির আনুষ্ঠানিক ফেসবুক পাতায়ও প্রকাশ করা হয়।
চার বছর পর সেই প্রতিশ্রুতি নতুন করে সামনে আনছেন আন্দোলনের শরিকরা। তাদের প্রশ্ন— ঘোষিত ‘জাতীয় সরকার’ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
শরিকদের অভিযোগ, বাস্তবে বিএনপি এককভাবেই সরকার পরিচালনা করছে। ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠিত হলেও যুগপৎ আন্দোলনের দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব সেখানে খুবই সীমিত। বিএনপির নেতারাই মন্ত্রিসভায় প্রাধান্য পেয়েছেন। এর বাইরে আরও ১০ জনকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ৫৯ সদস্যের এই কাঠামোয় আন্দোলনে সক্রিয় শরিক দলগুলো থেকে মাত্র দুজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে জাতীয় সরকারের ধারণা রাজনৈতিক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুগপৎ আন্দোলনের অন্যতম শরিক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বিএনপির জোটভুক্ত কয়েকজন নেতা সংসদে আছেন এবং দুজন প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। তবে সামগ্রিক বাস্তবতায় জাতীয় সরকার গঠিত হয়েছে— এমনটা বলা কঠিন। তার মতে, আন্দোলনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, সে সময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে দলটি হয়তো মনে করছে শরিকদের প্রয়োজন কমে গেছে। এতে করে ‘একলা চলো’ নীতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে ধারণা করা যায়।
ক্ষোভ প্রকাশ করে সাইফুল হক বলেন, রাজনৈতিক সমর্থন কখনোই শর্তহীন নয়। অথচ সরকার গঠনের তিন মাস পার হলেও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাশে থাকা শরিকদের সঙ্গে বিএনপির কোনো কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক যোগাযোগ নেই।
অন্যদিকে, কিছু শরিক নেতা অভিযোগ করেছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের প্রার্থীদের জয়ের জন্য বিএনপি যথাযথ সহায়তা দেয়নি। বরং দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্থানীয় কোন্দলের মুখে পড়তে হয়েছে শরিকদের।
নির্বাচনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, বিএলডিপির শাহদাত হোসেন সেলিম, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, এনডিএমের ববি হাজ্জাজ ও রেজা কিবরিয়া জয়ী হন। তবে শরিকদের অভিযোগ, এদের মধ্যে কয়েকজন সরাসরি যুগপৎ আন্দোলনের অংশ ছিলেন না। এর মধ্যে ববি হাজ্জাজ প্রতিমন্ত্রীও হয়েছেন।
বিএনপির আশ্বাসে আস্থা রেখে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শরিক নেতা। তারা এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। তাদের আশা, আন্দোলনে অংশ নিয়ে পরাজিতদেরও যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে।
তিনটি শরিক দলের নেতারা বলেছেন, আন্দোলনের সময় ঝুঁকি ছিল সমান, কিন্তু সরকারে অংশীদারত্বে তা প্রতিফলিত হয়নি। তাদের মতে, জাতীয় সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জয়ী ও পরাজিত সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। এমনকি সংরক্ষিত নারী আসন বা সম্ভাব্য উচ্চকক্ষ নিয়েও শরিকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে যে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। তারা আশা করেছিলেন সরকারে শরিকদের কার্যকর অংশগ্রহণ থাকবে।
আরেকজন বলেন, দুই-একজনকে প্রতিমন্ত্রী করলেই জাতীয় সরকার হয় না; সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
তবে ভিন্নমতও রয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা মনে করেন, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসেনি। তার মতে, যোগ্য প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচিতদের মধ্যে অনেকেই সরকারে স্থান পেয়েছেন। ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে শরিকদের আরও মূল্যায়ন করা হবে বলেও তিনি আশাবাদী।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, জাতীয় সরকার মানে সব দলকে সমান মন্ত্রণালয় দেওয়া নয়; বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিকে সম্পৃক্ত করাই মূল লক্ষ্য। এটি ধাপে ধাপে বিস্তৃত হবে।
দলটির এক মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জাতীয় সরকার একটি চলমান প্রক্রিয়া। শুরুতেই সব কিছু সম্পন্ন হয় না। শরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক আগের মতোই রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়তে পারে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিষয়টি দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিবেচনা করবেন। সংসদে এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এখনো শরিকদের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, কারণ নতুন সরকারের সময়কাল এখনো খুবই কম।





