ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান, অনুমোদন পেল ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প

দীর্ঘ ছয় দশকের প্রতীক্ষার পর অবশেষে চূড়ান্ত অনুমোদন পেল বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় মোট ১৬টি প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ১১ নম্বর কার্যতালিকায় ছিল পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প।
এর আগে কয়েক দফা একনেক সভায় প্রকল্পটি তোলা হলেও অনুমোদন পায়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হয়েছিল, তবে তখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশের নদী ব্যবস্থায় স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
একনেক সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা কমবে, মৃতপ্রায় নদীগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাবে। কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
১৯৭৫ সালে ভারত পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ করে। শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পানি ভাগীরথী-হুগলি নদীতে প্রবাহিত করা এবং বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত কলকাতা বন্দরের নাব্যতা উন্নত করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। তবে ফারাক্কার উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশ অংশে পদ্মা নদীর প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
এর প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়ালসহ বিভিন্ন নদী ক্রমেই শুকিয়ে পড়ে। এতে ওই অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব তৈরি হয়েছে।
ফারাক্কা ব্যারেজের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সরকার প্রথম ধাপে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হতে পারে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে স্বাদু পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, নৌ-চলাচল ও সুপেয় পানির সরবরাহ উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে পানি বণ্টন পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের পর থেকেই শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ অংশে পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ও খালে লবণাক্ততা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। এই পরিস্থিতি কৃষি, মৎস্য, নৌপথ, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।





