চিয়া সিড: আজটেক-মায়া সভ্যতার ঐতিহ্য থেকে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে নতুন স্বীকৃতি

চিয়া সিড, যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় স্বাস্থ্যকর খাদ্য হিসেবে পরিচিত, হাজার বছর আগে মধ্য আমেরিকার আজটেক ও মায়া সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ও কৃষিপণ্য ছিল—নতুন এক গবেষণায় এ তথ্যের সঙ্গে এর পুষ্টিগুণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রাচীন এই সভ্যতাগুলোতে চিয়া সিড শুধু খাদ্য হিসেবেই নয়, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ইতিহাসবিদদের মতে, ভুট্টা, শিম ও স্কোয়াশের পাশাপাশি চিয়াও ছিল প্রধান খাদ্যসম্পদ। অনেক ক্ষেত্রে এটি শাসকদের কর বা খাজনা হিসেবে প্রদান করা হতো এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও ব্যবহৃত হতো।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনাধর্মী গবেষণায় চিয়া সিডের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার ফলাফল একত্র করে পরিচালিত হয়। এতে দেখা গেছে, চিয়া সিডে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, উচ্চমানের উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, দ্রবণীয় আঁশ এবং বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ উপাদান।
গবেষণা অনুযায়ী, চিয়া সিডের প্রোটিন ভেঙে এমন যৌগ তৈরি হয়, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। এছাড়া এতে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও চিয়া সিডের ইতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর দ্রবণীয় আঁশ পানির সঙ্গে মিশে জেল তৈরি করে, যা খাদ্য হজমের সময় গ্লুকোজ শোষণের গতি কমিয়ে দেয়। ফলে খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বৃদ্ধি পায় না।
এছাড়া চিয়া সিড দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখার মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। এর আঁশ অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে, যা সামগ্রিক অন্ত্রস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
খাদ্যশিল্পেও চিয়া সিডের ব্যবহার বাড়ছে। এর জেল তৈরির বৈশিষ্ট্যের কারণে গ্লুটেন-মুক্ত বেকারি পণ্য, চর্বির বিকল্প উপাদান এবং ভিগান খাদ্যে ডিমের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে গবেষণায় কিছু সতর্কতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে চিয়া সিডে অ্যালার্জি হতে পারে এবং এতে থাকা ফাইটিক অ্যাসিড শরীরে কিছু খনিজের শোষণ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। পাশাপাশি, সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে এতে থাকা অসম্পৃক্ত চর্বি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
গবেষকেরা আরও জানান, চিয়া বীজের স্বাভাবিক অণুজীবসমষ্টি এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। এ বিষয়ে আরও গবেষণা হলে চিয়ার পুষ্টিগুণ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, চিয়া সিডকে শুধু সাময়িক জনপ্রিয় ‘সুপারফুড’ হিসেবে নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা।





