খুলনায় ট্রিপল হত্যাকাণ্ড: তিন দিন ঘরে ছিল মরদেহ, ভয়াবহ তথ্য উঠে আসছে তদন্তে

খুলনা জেলা প্রতিনিধি: ফাহিম ইসলাম
খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকার আলোচিত ট্রিপল হত্যাকাণ্ডে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। নানি ও দুই নাতিকে হত্যার পর মরদেহ তিন দিন একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সময় নিহত শিশুদের মা ফাতেমা বেগম মেরি এবং তার দ্বিতীয় স্বামী রফিকুল ইসলাম বাসাতেই অবস্থান করছিলেন বলেও জানা গেছে।
শনিবার (৩০ মে) সন্ধ্যায় নগরীর দারুল আমান মহল্লার একটি ভাড়া বাসা থেকে বেবী বেগম (৬৫), তার নাতি শামীম (১৩) ও মুস্তাকিমের (৪) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো খুলনাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঈদুল আজহার দিন থেকে টানা কয়েক দিন বাসাটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পান প্রতিবেশীরা। দীর্ঘ সময় ঘর বন্ধ থাকায় এবং আশপাশে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ দেখা দেয়। পরে বাসা থেকে দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহগুলো উদ্ধার করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ তিনটি একটি কক্ষে রেখে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ফাতেমা বেগম মেরি ও তার স্বামী রফিকুল ইসলাম একই বাসার অন্য একটি কক্ষে অবস্থান করছিলেন। ঘটনার পর থেকেই রফিকুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন।
নিহত দুই শিশুর বাবা মাসুম বেপারি অভিযোগ করে বলেন, তার সাবেক স্ত্রী ফাতেমা বেগম মেরি এবং বর্তমান স্বামী রফিকুল ইসলাম এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বেবী বেগম তার মেয়ের দ্বিতীয় স্বামী রফিকুলকে পছন্দ করতেন না। রফিকুলের সঙ্গে পরিবারে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো। বিশেষ করে নিহত দুই শিশু ছিল ফাতেমার প্রথম স্বামীর সন্তান। এ নিয়ে রফিকুলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক অশান্তি চলছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
মহেশ্বরপাশা এলাকার কয়েকজন ট্রাকচালক জানান, রফিকুল ইসলাম মাদকাসক্ত ছিলেন এবং প্রায়ই মাতাল অবস্থায় চলাফেরা করতেন। এ কারণে পরিবারে নানা ধরনের বিরোধ লেগেই থাকত।
নিহত বেবী বেগমের বোন রেনু বেগম জানান, তার বোন নাতিদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং সবসময় আগলে রাখতেন। কিন্তু রফিকুল ওই দুই শিশুকে মেনে নিতে চাইতেন না। এ বিষয় নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হতো।
রেনু বেগম বলেন, শনিবার সন্ধ্যার আগে তিনি বোনের খোঁজ নিতে বাসায় যান। তখন ঘরে তালা ঝুলতে দেখেন এবং ভেতর থেকে দুর্গন্ধ পান। রফিকুলকে ডাকাডাকি করলে তিনি বেরিয়ে এসে বলেন, ‘মরা ইঁদুরের গন্ধ।’ পরে দরজা খুলতে বললেও তিনি রাজি হননি। একপর্যায়ে জোর করে তালা কাটার চেষ্টা করা হলে রফিকুল সেখান থেকে পালিয়ে যান।
পরে স্থানীয়দের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে খাটের নিচে বেবী বেগমের মরদেহ এবং একটি ট্রাংকের ওপর শামীমের মরদেহ পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ ছোট শিশু মুস্তাকিমকে খুঁজতে শুরু করে। পরে সিআইডির সদস্যরা একটি ওয়ারড্রবের ভেতর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে ফাতেমা বেগম মেরি জানিয়েছেন যে, গত চার বছরের সংসার জীবনে তার দ্বিতীয় স্বামী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো। ঘটনার রাতে রফিকুল মাতাল অবস্থায় ছিলেন এবং বেবী বেগমের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়েছিল। তবে এরপর কী ঘটেছিল সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
তদন্তে আরও জানা গেছে, চার বছর আগে ফাতেমা বেগম মেরির সঙ্গে প্রথম স্বামী মাসুম বেপারীর বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর তিনি ট্রাকচালক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে সংসার শুরু করেন। নিহত দুই শিশু মায়ের সঙ্গেই বসবাস করছিল এবং তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব মূলত নানি বেবী বেগম পালন করতেন।
নিহত শিশুদের দাদা কাশেম বেপারি বলেন, পরিবারের নানা সমস্যার মধ্যেও বেবী বেগম নাতিদের খুব ভালোবাসতেন। তিনিই শিশু দুটিকে লালন-পালন করতেন। অন্যদিকে শিশুদের বাবা মাসুম বেপারিও নিয়মিত তাদের খোঁজখবর নিতেন।
সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে পলাতক রফিকুল ইসলামকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, ২৯ মে রাত ২টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। হত্যার আগে ভুক্তভোগীদের খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক জাতীয় কিছু মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে, যাতে তারা চিৎকার করতে না পারেন। পরে তাদের গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, পলাতক রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।






