মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে কেন মাথায় ভিড় করে দুশ্চিন্তা?

রাতের গভীরে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং এরপর নানা দুশ্চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাওয়া অনেকের কাছেই পরিচিত অভিজ্ঞতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সবসময় গুরুতর কোনো সমস্যার লক্ষণ না হলেও শরীরের ঘুমের চক্র, মানসিক চাপ এবং জীবনযাপনের নানা বিষয়ের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ঘুম কোনো একটানা অবস্থা নয়। এটি কয়েকটি ধাপে বিভক্ত, যার মধ্যে রয়েছে হালকা ঘুম, গভীর ঘুম এবং স্বপ্ন দেখার পর্যায় বা আরইএম (র্যাপিড আই মুভমেন্ট) স্লিপ। সাধারণত প্রতি ৯০ মিনিট পরপর এই চক্র পরিবর্তিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতের প্রথম ভাগে গভীর ঘুম বেশি হয়। তবে রাত ২টা থেকে ৩টার দিকে শরীর ধীরে ধীরে পরবর্তী দিনের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। এ সময় ঘুম তুলনামূলক হালকা হয়ে আসে এবং সামান্য শব্দ, আলো, শারীরিক অস্বস্তি কিংবা মানসিক চাপের কারণেও ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ঋষভ ভার্মার মতে, এই সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম সক্রিয় হতে শুরু করে। ফলে ঘুমের গভীরতা কমে যায় এবং মানুষ বাইরের উদ্দীপনার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুম ভেঙে যাওয়ার চেয়ে বড় সমস্যা হলো এরপর আবার ঘুমাতে না পারা। কারণ তখন অনেকের মন কাজ, অর্থনৈতিক সমস্যা, পারিবারিক উদ্বেগ বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় ডুবে যায়।
নিউরোলজিস্ট ডা. প্রশান্ত মাখিজার মতে, রাতের বেলা চারপাশের কোলাহল কমে গেলে মস্তিষ্ক অসমাপ্ত কাজ বা ব্যক্তিগত উদ্বেগের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে শুরু করে। বিশেষ করে আরইএম ঘুমের সময় আবেগ-সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অংশ বেশি সক্রিয় থাকে, ফলে দুশ্চিন্তাগুলো বাস্তবের চেয়ে বড় বলে মনে হতে পারে।
ঘুমের ব্যাঘাতের পেছনে হরমোনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মেলাটোনিন ঘুম বজায় রাখতে সাহায্য করে, আর কর্টিসল শরীরকে জাগিয়ে তোলার প্রস্তুতি নেয়। মানসিক চাপ বা উদ্বেগ বেশি থাকলে কর্টিসলের মাত্রা আগেভাগেই বেড়ে যেতে পারে, যা ঘুম ভাঙার কারণ হতে পারে।
এ ছাড়া উদ্বেগ, বিষণ্নতা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, থাইরয়েড সমস্যা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম বা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও মাঝরাতে ঘুম ভাঙার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেরি করে ভারী খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ, অ্যালকোহল পান এবং ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা অন্যান্য স্ক্রিন ব্যবহারও ঘুমের গুণগত মান নষ্ট করে।
ভালো ঘুমের জন্য ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ট্যাব বা টেলিভিশনের ব্যবহার কমানো, হালকা পরিবেশে সময় কাটানো, নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা এবং ঘুমের আগে ভারী খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
তাদের মতে, মাঝেমধ্যে রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে যদি নিয়মিত এমন হয় এবং দীর্ঘ সময় জেগে থাকতে হয়, তাহলে তা অনিদ্রা বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।





