নানা কৌশলে কারাগারে ঢুকছে মাদক, কারারক্ষীরাও জড়িত

দেশের কারাগারগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কৌশলে হেরোইন, ইয়াবা ও গাঁজাসহ নানা ধরনের মাদক প্রবেশ করছে। শুধু বন্দিরাই নন, কিছু কারারক্ষীর বিরুদ্ধেও মাদক কারাগারের ভেতরে নেওয়া ও সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। কারা অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার না করলেও বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তল্লাশির সময় মাদক জব্দ করা হয়।
কারা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ মে থেকে ২০২৬ সালের ২০ মে পর্যন্ত দুই বছরে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধে ৩ হাজার ৬১৭ জন শাস্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে ৫৭ জন ছিলেন কারারক্ষী। অভিযুক্ত কারারক্ষীদের মধ্যে ২৮ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, আর বাকিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে কারাগারগুলো থেকে ১৩ কেজি ৯০০ গ্রাম গাঁজা, ১১ হাজার ৮৬ পিস ইয়াবা এবং ৫৫৬ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত উল ফরহাদ বলেন, কারাগারের ভেতরে মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগের কিছু ভিত্তি থাকলেও অনেক তথ্য অনুমাননির্ভর। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়া কিছু বন্দি ইয়াবা প্লাস্টিকের মোড়কে ক্যাপসুলের মতো তৈরি করে গিলে ফেলেন এবং পরে কারাগারে ফিরে তা বের করে ব্যবহার করেন। তিনি জানান, এ ধরনের ঘটনা শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি কারা ফটকে বন্দি ও কারারক্ষী—সবারই তল্লাশি করা হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ফটকে যে পরিমাণ মাদক ধরা পড়ে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ মাদক নানা উপায়ে ভেতরে প্রবেশ করে। কারাগারের অভ্যন্তরে এসব মাদক চড়া দামে বিক্রি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু কারারক্ষীর সহায়তায় বন্দিরা সহজেই মাদক সংগ্রহ করতে পারেন।
সম্প্রতি গাজীপুরের কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সে কর্মরত কারারক্ষী মো. মশিউরের বিরুদ্ধে মাদক কারবার ও সেবনের অভিযোগ ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে মাদক সেবন করতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে নয়টি বিভাগীয় মামলা রয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন। কর্তৃপক্ষ তাকে কারাগারের অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ জুন নীলফামারী জেলা কারাগারে দায়িত্ব পালনের সময় কারারক্ষী সালমান শাহর কাছ থেকে গাঁজা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়। একইভাবে বিভিন্ন কারাগারে বন্দিদের কাছ থেকেও মোবাইল ফোন ও মাদক উদ্ধারের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই বছরে মাদক বহন ও সেবনের দায়ে ৩ হাজার ৫৬০ জন বন্দিকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ১১ কেজির বেশি গাঁজা, প্রায় সাড়ে ৯ হাজার ইয়াবা, ২৯১ গ্রাম হেরোইন এবং ৫৩৭টি ডিসোপ্যান-২ ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনায় অনেকের বিরুদ্ধে নতুন ফৌজদারি মামলাও হয়েছে। এছাড়া শাস্তি হিসেবে ডিভিশন সুবিধা বাতিল, নির্দিষ্ট সময় সেলে আবদ্ধ রাখা, সাক্ষাৎ বন্ধ করা, হাতকড়া বা ডান্ডাবেড়ি পরানোর মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কারা কর্মকর্তারা বলছেন, মাদক-সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে কারারক্ষীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোরতা দেখানো হয়। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী চাকরিচ্যুতি, বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, পদোন্নতি বন্ধ, সতর্কীকরণ বা তিরস্কারের মতো শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে কারাগারে মাদক প্রবেশ পুরোপুরি ঠেকাতে নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর তল্লাশি ব্যবস্থা আরও জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





