১৪ বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়, যানজট নিরসনে বিআরটি প্রকল্পের সুফল নিয়ে বড় প্রশ্ন

পরিকল্পনা ছিল সড়কের মাঝখান দিয়ে কেবল বিশেষ দ্রুতগতির বাস (বিআরটি) চলাচল করবে। এর ফলে যাত্রীদের যানজট কিংবা সিগন্যালে আটকে থাকতে হবে না। তবে ৪ বছরের সেই প্রকল্প ১৪ বছর ধরে চললেও আজ পর্যন্ত সড়কে বাস নামেনি, কমেনি মানুষের দুর্ভোগও। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের বর্তমান চিত্র এটিই।
প্রকল্পের শুরুতে বলা হয়েছিল, এটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী কোনো ধরনের যানজট বা সিগন্যালের বাধা ছাড়াই যাতায়াত করতে পারবেন। তবে দীর্ঘ ১৪ বছর পর প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা খরচের মাথায় এসে জানা যাচ্ছে, এই লক্ষ্য পূরণ হওয়া প্রায় অসম্ভব; উল্টো এর কারণে যানজট ও জনভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। ফলে প্রকল্পটি এখন পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়ার আলোচনা জোরালো হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের গঠিত দুটি কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল এমন অভিমত দিয়েছে। বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের এই দল গত মাসে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিআরটি প্রকল্পটি দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে একটি 'পদ্ধতিগত ব্যর্থতার' বড় উদাহরণ। যথাযথ কারিগরি যাচাই, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহির তীব্র অভাব ছিল এখানে। নকশাগত দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞ দল বিআরটি কার্যক্রম পুরোপুরি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের জোর সুপারিশ করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, প্রকল্পটি বাতিল করার পক্ষে জোরালো মত রয়েছে। তবে বাতিল না করে আরও কিছু অর্থ বিনিয়োগ করে আংশিক সুবিধা পাওয়া যায় কি না, সেই মতও আছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং তা মন্ত্রিসভায় তোলা হবে।
ঋণের টাকায় গড়া অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে
সরেজমিনে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশনের অবকাঠামো তৈরি করা হলেও কোনোটির কাজই সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। স্টেশনগুলোর কিছু সমতলে এবং কিছু উড়ালপথে অবস্থিত। যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য আধুনিক পথচারী পারাপার, চলন্ত সিঁড়ি ও লিফটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে উত্তরার একটি চলন্ত সিঁড়ি চালুর পরই অচল হয়ে গেছে, অন্যগুলোর যন্ত্রপাতিতে জং ধরছে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের কাভার্ড ভ্যান চালক মো. সোহেল জানান, ২০২২ সালের বর্ষায় বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পার হতে তার ১০ ঘণ্টা লেগেছিল। বিআরটি লেনে এখন সব ধরনের গাড়ি চলায় প্রায়ই জট লেগে থাকে। সাইন-সংকেত না থাকায় এবং সড়ক সরু হওয়ায় গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
উত্তরা এলাকায় বিআরটি লেন আলাদা করতে লোহার বেড়া দেওয়া হলেও অনেক জায়গায় তা ভেঙে মানুষ পারাপার হচ্ছে। পুরো ২০ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে অসংখ্য পোশাক কারখানা থাকায় ছুটির সময়ে শ্রমিকদের পারাপারে বেশ ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। পুরো সড়কে এক ফুটের মতো উঁচু সিমেন্টের ডিভাইডার দিয়ে লেন আলাদা করা হয়েছে, যা ভাঙতে গেলেও এখন বড় অঙ্কের টাকা লাগবে।
১৪ বছরের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ
২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ি পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিআরটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১৫ দশমিক ০৭ কিলোমিটার সড়কপথ এবং বাকিটা উড়ালপথ। দীর্ঘ এক যুগ ধরে এই কাজের জন্য বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। নির্মাণকাজের অবহেলায় ক্রেন দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা এবং ২০১৬ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে তিনবার প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা করা হলেও কাজ শেষ হয়নি। ২০২৫ সালে চতুর্থবার সংশোধনের প্রস্তাব দিয়ে ব্যয় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছিল, যা তৎকালীন একনেক সভায় অনুমোদন পায়নি।
প্রকল্প নিয়ে জটিলতা ও গলার কাঁটা
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) মনে করছে, কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকায় এখন এটি বাতিল করা ঠিক হবে না। অবকাঠামো ভাঙতে গেলেও ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণসহ প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা খরচ হতে পারে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। বন্ধ করলে ঋণের টাকা পানিতে যাবে, আবার চালু করতে নতুন করে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা দিয়ে বাস কিনতে গেলে তা সফল হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এই প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ)।
নকশাগত ত্রুটি ও সমন্বয়হীনতা
বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি সফল হলেও বাংলাদেশে এটি ব্যর্থতার মুখে পড়েছে মূলত অপরিকল্পিত নকশার কারণে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে সাধারণত ১২ থেকে ১৪ লেনের সড়কে বিআরটি হয়। কিন্তু গাজীপুরে সড়ক ৪ লেনের এবং বিমানবন্দরে ৬ লেনের। এত সরু সড়কের মাঝখানে দুটি লেন আলাদা করা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
তা ছাড়া সওজ, সেতু বিভাগ এবং এলজিইডি—এই তিনটি সরকারি সংস্থা আলাদাভাবে কাজটি করায় কোনো সমন্বয় ছিল না। বুয়েটের প্রতিবেদনে এই ব্যর্থতার জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষাকারী, নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক, প্রকল্প পরিচালক এবং পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। স্টেশনের অব্যবহৃত লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি অন্য সরকারি ভবনে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, এটি একটি চাপিয়ে দেওয়া প্রকল্প ছিল। নকশা ও সমীক্ষায় বড় ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়নকারী সংস্থা বা পরিকল্পনা কমিশন তা ধরেনি। এই অপরিপক্ব প্রকল্প এক যুগ ধরে মানুষকে কষ্ট দিয়েছে। জনগণের কোনো উপকারেই আসেনি এটি, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় শিক্ষা হওয়া উচিত।






